বিভীষিকাময় ক’টি দিন
অনেকদিন গ্রামের বাড়ি যাওয়া হচ্ছে না। জীবনব্যস্ততার অদৃশ্য মায়াজালে আটকে আছি।
রবি থেকে বৃহস্পতি অফিস আর শুক্র-শনি বিএডের ক্লাস। রুটিন পড়েছে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে
বোর্ড পরীক্ষা। তাই এমাসেই কলেজের সর্বশেষ ও চূড়ান্ত (অভ্যন্তরীণ) পরীক্ষাও হয়ে যাবে।
চাকুরির ব্যস্ততার কারণে প্রস্তুতি তেমন নিতে পারিনি। আসলে ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকুরি
করে বিএডের মত একটি নিয়মিত ও ব্যবহারিক কোর্স সম্পন্ন করা কঠিন এবং দু:সাহসিক কাজও
বটে।
২০১১সালের ডিসেম্বরের ভয়াল শেষ সপ্তাহ। আমার জীবনব্যস্ততা আর জীবনবাস্তবতার গোলকধাঁধার
মাঝে জীবনসায়াহ্নে মা। মায়ের অসুখটা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। চকবাজার মতি টাউয়ারের পেছনে
জয়নগরের একটি বাসায় থাকতাম। আগে মাসে অন্তত একবার হলেও মাকে গিয়ে দেখে আসতাম। এবার
বিএড পরীক্ষা, অফিসে ছুটি না থাকা,
বাসাবদল সবকিছু মিলে এই নভেম্বর-ডিসেম্বরে
কোনোভাবেই ককসবাজার যাওয়া হচ্ছে না। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহজুড়ে একটানা প্রতিদিনই পরীক্ষা।
সিএল শেষ হয়ে গেলেও পরীক্ষার রুটিন দেখিয়ে অনেক অনুনয়বিনয় করে আরো কয়েকটা দিন ছুটি
ম্যানেজ করেছি। আবার একত্রিশ ডিসেম্বর বাসা ছাড়ার কথা বাড়িওয়ালাকে আগেই বলা হয়ে গেছে।
নতুন ভাড়াটিয়া তাদের পুরোনো বাসা ছেড়ে ঐদিনই
আমার বাসায় উঠবে।
বিএড বোর্ড পরীক্ষা যথারীতি শুরু হয়ে গেছে। কয়েকদিন পরপর মায়ের অবস্থার ক্রমাবনতির
দু:সংবাদ আসতে থাকে। দিশেহারা হয়ে পড়লাম। বিএড কলেজের প্রিন্সিপাল কলিমুল্লাহ স্যার
আমার (অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার) উত্তরপত্র দেখে বলেছিলেন, তুমি এত শর্ট অ্যানচার করলে ফাইনাল পরীক্ষায় ফার্স্টক্লাস পাবে না।
অ্যানচার আরেকটু ব্রড করতে হবে। তখন থেকে টেনশন আরো
বেড়ে গিয়েছিল। একদিকে লেখায় আমার হাত দ্রুত চলে না অন্যদিকে দৈনিক ১০ঘন্টা চাকুরি করে
ভাল প্রিপ্যারেশন তো হয়-ই না।
৩০ডিসেম্বর পরীক্ষা দিয়ে এসে পরের দিনের (৩১ডিসেম্বর) প্রস্তুতি নিতে বই খুললাম।
গতকালও পরীক্ষা ছিল। বাড়ি হতে হঠাৎ ফোন এল মায়ের অবস্থা আশংকাজনক। ডাক্তার বলে দিয়েছেন
কক্সবাজারের চিকিৎসা শেষ। অক্সিজেন সিলিন্ডার লাগিয়ে অ্যাম্বুলেন্স করে চট্টগ্রাম মেডিক্যালের
উদ্দেশ্যে নিয়ে আসা হচ্ছে। মাকে রাত বারোটায় সিএমসিতে ভর্তি করিয়ে অদূরে জয়নগরের বাসায়
এসে নির্ঘুম আতঙ্কের প্রহর গুনছিলাম। ভোর চারটায় ভাইয়ের ফোন: ’মা আর আমাদের মাঝে নেই।’ (ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
হাসপাতালের ফরমালিটিজ শেষ করে সকাল সাড়ে ৭.৩০টায়
আমার ভাই, বোন, স্ত্রী ও সাথে আসা সোমাসহ লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স
কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। বললাম, আমি একটু পর রেডি হয়ে অন্য গাড়িতে করে আসছি। বলতে পারলাম না যে আজ সকাল ৯.০০টায় আমার পরীক্ষা আছে। বিএডে আমার
সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাও ছিল এটি। শোকসন্তপ্ত ক্লান্ত দেহমন নিয়ে পরীক্ষার হলে উপস্থিত
হয়ে অশ্রুসজল নয়নে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। ঘণ্টা দেড়েক পর উত্তরপত্র জমা দিয়ে উদ্ভ্রান্ত
উন্মাদের মত কক্সবাজারের গাড়ি ধরলাম। চার ঘণ্টার এপথ আজ যেন শেষ হতে চাইছে না। বাড়িতে
দূরদূরান্তের আত্মীয়স্বজন সবাই এসে হাজির। ইতোমধ্যে মায়ের লাশবাহী গাড়িও পৌঁছে গেছে।
ঢাকায় অবস্থানরত বড়ভাই (উইং কমান্ডার মোস্তাক আহমদ) বিশেষ বিমানযোগে চলে এসেছে। এদিকে
বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসছে। মায়ের জানাজা পড়াবো আমি। এখন সবার অস্থির অপেক্ষা শুধু
আমার জন্য। ফোনের পর ফোন আসতে থাকে এখন কতদূর এসেছি। কিন্তু আমার পথ যে শেষ হয় না!
আমি যখন পৌঁছলাম সুর্য একেবারে ডুবুডুবুপ্রায়। মা আমার জন্য শেষ প্রতীক্ষা করছিল।
বাড়িতে অসংখ্য চেনাঅচেনা নারীপুরুষ মাকে বিদায় জানাতে এসেছে। সবাই গম্ভীর ভাবলেশহীন
বেদনা ভারাক্রান্ত। ঘনিষ্ঠজনদের ক্রন্দনও থেমে এসেছে। সবার চোখে-মুখে কেবল বিষাদ আর
বেদনার চাপ। এ মুহূর্তে কারো সাথে কুশল বিনিময় করার সময় আমার নেই, তাদেরও নেই। অন্তিম বিদায় বেলায় মা জননীর মুখটা
শেষবারের মত দেখে পুঞ্জীভূত লুকানো বেদনায় একবার প্রাণ উজাড় করে উচ্চস্বরে কাঁদার সুযোগও
কেউ আমাকে দিলো না। পাশের বাড়িতে গিয়ে দ্রæত প্যান্ট শার্ট পাল্টানোর সময়টুকু কেবল পেলাম। সবাই ছুটল মায়ের লাশ নিয়ে জানাজার
মাঠের দিকে।
জানাজা সালাত শেষে দাফন পরবর্তী গোরসাজানোর বাকী কাজটুকু ভাইয়েরা করছিল। মায়ের
ঘরে বসে বিমর্ষবেদনাহত আত্মীয়স্বজনেরা একে একে মায়ের স্মৃতিচারণ করে যাচ্ছিল। আমি তাদের
মাঝে কেবল উপস্থিতি জানান দিয়ে সে রাতেই আবার রওয়ানা দিলাম সুদূর চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে।
বললাম, এখনই আমাকে একটু জরুরি
চট্টগ্রাম যেতে হচ্ছে, সকালে চলে আসবো। আগামীকাল
আমার পরীক্ষা আছে এ কথা বলার পরিবেশ নেই, শোনারও কেউ নেই। তার উপর কালকেই বাসা ছেড়ে না দিলে নতুন ভাড়াটিয়া বিপদে পড়বে। কারণ
তাদের বাসায়ও নতুন ভাড়াটিয়া বর্তমান বাসা ছেড়ে দিয়ে এসে পড়বে। তাই মায়ের মৃত্যু ও পরীক্ষা
যা-ই থাকুক কালকেই বাসা ছেড়ে দিয়ে নতুন বাসায় উঠতে হবে। বাসার বিশাল আসবাব ও জিনিসপত্র
গোছগাছের সব কাজ আমাকে একাই করতে হবে। বাসায় পৌঁছলাম রাত ১.৩০টায়। চোখে ঘুম নেই- ঘুমের
সময়ও নেই। দেহমনে সপ্তাহের ক্লান্তি, মাতৃশোকে মুহ্যমান, ক্ষুধপিপসায় জর্জরিত,
আগামীকালের পরীক্ষা ও আগামীকালই
বাসা পাল্টানোযজ্ঞ! এভাবে ছটফট করতে করতে কোনোভাবে রাতের বাকী প্রহর পোহায়ে পরিক্ষাহলে
উপস্থিত হলাম। ইতোমধ্যে নতুন ভাড়াটিয়া তাদের আসবাবপত্রাদি নিয়ে এসে উপায়ান্তর না দেখে
বাড়ির ছাদেই রেখে দিয়েছে। আমি পরীক্ষা দিয়ে এসে বহুকষ্টে আমার সবকিছু গুছিয়ে নতুন বাসায়
গিয়ে উঠলাম।
হায়রে জীবনসংগ্রাম, জীবনের অন্তহীন ব্যস্ততা!
হায়রে আমার বিএড পরীক্ষা, আর এরই মাঝে মায়ের
অন্তিম বিদায়! বিএড ফার্স্ট ক্লাস পেলেও এ সার্টিফিকেটে অদৃশ্য হরফে লেখা আছে মায়ের
বেদনাবিধুর বিদায়ের সকরুণ স্মৃতিগাঁথা যা আমি ছাড়া কেউ পড়তে পারে না। আজ মনে হয় এত
কষ্টার্জিত বিএড আমার জীবনে কী কাজে আসলো? শিক্ষকতার সুমহান পেশায় জীবন বিলিয়ে দেবার একরাশ সোনালি স্বপ্নে বিভোর হয়ে বিএড
ও পরবর্তীতে এমএড ডিগ্রি অর্জন করলেও আজ আমার জীবন কেটে যাচ্ছে ব্যাংক নামক এক নিরানন্দ
বন্দীশালার অন্ধকার কুটুরিতে।
(২১/০২/২০২৩)

All are requested to read this article
ReplyDelete