আমার পদোন্নতির সাতকাহন
মুহাম্মদ দিদারুল আলম
ছোটকাল থেকেই শিক্ষকতার প্রতি অদম্য ঝুঁক ছিল আমার। বেশ ক’টি সরকারি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকুরি করে কৃষ্ণপক্ষের কোন এক অশুভ রজনীতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম শিক্ষকতার সুহমহান পেশা ছেড়ে দিয়ে ব্যাংকে চাকুরি নেবো। একদিন তাই করলাম। ‘কপোতাক্ষ নদ’-এ মাইকেল মদুসুদনের বুকফাঁটা আত্মচিৎকার বইয়ের পৃষ্ঠায় চাপা পড়ে রইল। জীবন চলার গতিপথ (Course of life) পরিবর্তন করে একদিন বৃন্তচ্যুত(Derail) আমি ঢুকে পড়লাম ব্যাংক নামক কৃষ্ণগহ্বরের (Black Hole) অন্ধকার প্রকোষ্টে। শুরু হল আমার জীবনের কালো অধ্যায়। ঈষাণ কোনের ঘনকালো মেঘ ছেয়ে ফেলে জীবনের শুভ্রাকাশ। বর্ষার ঘনঘটায় আমি পথ হারাই।
ছাত্রজীবনে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন কায়েমের দূর্ণিবার স্বপ্নে বিভোর ছিলাম। কিন্তু ইসলামী অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মোহভঙ্গ ও পরবর্তীতে স্বপ্নভঙ্গ হতে আমার বেশীদিন লাগেনি। ঈমানি তামান্নায় আবেগের তাড়নায় ইসলামি একটি ব্যাংকে জীবন সঁপে দিয়ে দেখতে পেলাম আল্লামা মওদুদীর তাত্ত্বিক ইসলামি অর্থনৈতিক দর্শন ও ড: উমর চাপড়ার আধুনিক ইসলামি ব্যাংকিং এখানে অচল। When you are in Rome, do as the Romans হল শরীয়াহ ব্যাংকিং যেখানে ‘সাপও মরে লাঠিও ভাঙ্গে না।’
একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কর্মচারীদের পদোন্নতি (Promotion) হয় তাদের জ্ঞান, দক্ষতা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, জৈষ্ঠ্যতা কিংবা পদোন্নতি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে। কিন্তু আমার কর্মালয়ে প্রতিবছর সবার প্রমোশন হলেও ‘আমার নাম ডাক পড়ে না মা…’ করতে করতে জীবন থেকে আঠারোটি বছর অন্ধকারে হারিয়ে গেলো। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি আমার সহকর্মী ও জুনিয়রগণ দিনদিন প্রতিদিন এগিয়ে যাচ্ছেন আমাকে পশ্চাতে ফেলে। একসাথে যোগদানকারী সহযোদ্ধাগণ আজ অনেকেই শাখা ব্যাবস্থাপক বা তদুপরে চলে গেছেন আমাকে ভ্রুকুটি মেরে। আমি জীবনযুদ্ধের চাকুরি যুদ্ধে (আসলে তৈলযুদ্ধে) পরাজিত ধরাশায়ী আহত এক সৈনিক। আমি ভূখা-নাঙ্গা-কাঙ্গাল ফুটপাতে পড়ে থাকা এক অসহায় মুসাফির অসীম শূণ্যতা পানে অপলক চাহিয়া চাহিয়া (Waiting for Godot) অকারনে সকরুন ব্যতিত হই। পদোন্নতির আশায় কতোবার কতোবছর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ভাইভা আলিঙ্গন (Embrace) করেছি কিন্তু প্রমোশন আমাকে একবারও আলিঙ্গন করেনি। প্রতিবার ফলাফলে সবাই প্রমোশন পেয়ে এগিয়ে যাওয়ায় আমি নতুন করে আরো একধাপ পিছিয়ে (Degradation পড়ি। এভাবে একদিন ভাইভাতে ক্ষ্যান্ত দিলাম এই ভেবে যে ‘আঙ্গুর ফল টক’। আর হতে চাই না ভাইভা নামক প্রমোশন নাটকের পাঁটাবলি। অগত্যা একদিন নিজের সীমাহীন অযোগ্যতার কাছে বশ্যতা স্বীকার করে নিভৃতে ‘আমি চিৎকার করে কাঁদিতে চাহিয়া করিতে পারিনি চিৎকার…’ করতে করতে ঘোষণা দিয়ে দিলাম ‘আমার প্রমোশন লাগবে না ভাই, তোমরা প্রমোশনের নামে আমাকে আর জ্বালাতন করো না।’
ব্যাংক মামা বলে, ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে আমার যোগ্যতা নিতান্তই নগণ্য ও অপ্রতূল। এই সীমিত যোগ্যতাবলে এ পথ আমি বেশিদূর পাড়ি দিতে পারবো না। অন্যদিকে আমার বিশ্লেষণে (Self-Analysis) স্বীয় যোগ্যতা নিরূপণ (Postmortem) করতে গেলে তা হবে আত্মকথনে অতিবচন- নিজের ঢোল নিজেই পেটানো। যাই হোক, আর দশজনের মতো আমারও তিনটি যোগ্যাতা ছিল যেগুলোর জন্য আমি গর্ব করতে পারি যেমন-
খ) কর্ম সম্পাদনে দক্ষতা (Skillfulness)
গ) দায়িত্বে আন্তরিকতা (Dedication & Devotion)
এছাড়া একটি আধুনিক ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একজন প্রাগ্রসর কর্মকর্তা হিসেবে আমি আরো তিনটি যোগ্যতার বিকাশে অহর্নিশ আত্মনিবেশী ছিলাম। যেমন-
খ) কম্পিউটার দক্ষতা (ICT Skill)
গ) শরীয়াহ জ্ঞান (Core Islamic Knowledge)
একবার নতুন শাখায় বদলী হলে শাখা ব্যাবস্থাপক (বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষক) অল্পদিনেই আমার ভেতরের ‘আমি’ কে তাঁর মত করে আবিষ্কার করে নিলেন। তিনি আমার মত (?) একজনের এতদিন প্রমোশন না হওয়ায় বিশ্ময় প্রকাশ করে সমব্যাথী হলেন। বললেন, “আপনি 100% নিশ্চিত থাকেন যে, এবার আপনার প্রমোশন হয়েই গেছে। আমিই সব ঠিক করে দিচ্ছি, আপনার প্রমোশন আমার হাতে, আপনার কিছুই করা লাগবে না, ভাইভা বোর্ডে শুধু যাবেন আর আসবেন। আঞ্চলিক প্রধানের (Zonal Head) সাথে আমার একদম তুইতুকারি সম্পর্ক। কার প্রমোশন হবে কার হবে না তা তো আমারাই ঠিক করে দেই।” ব্যাবস্থাপক
মহোদয়ের এমন ভয়ংকর (!) আশ্বাসবাণী শোনে আমার অন্তরের শুকিয়ে যাওয়া ঘা-তে পুরনো ব্যাথা নতুন করে উথলে উঠলো। ভাবলাম, এ ইনসাফের (!)
যাঁতাকলে পড়েই
বুঝি এতদিন আমার প্রমোশন হয়নি। আগে ভাবতাম এখানে প্রমোশন হয় যোগ্যতার (Justice) ভিত্তিতে অর্থাৎ জ্ঞান, কর্মদক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে। পরে বুঝলাম যোগ্যতা নয়, প্রমোশন হয় এসিআর (ACR) ও ম্যানেজারের বরদৃষ্টির কল্যাণে আর এখন দেখি ওসব কিছুই না, প্রমোশন বরাদ্দ হয় ‘লাইলাতুল
বরাতে’… (?). The western
sky becomes gloomy.
সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে একদিন আমার কাংখিত প্রমোশনের অধরা পাগলা ঘোড়া পোষ মানল। পনের বছর পর তারা আমার কপোলে ‘জুনিয়র অফিসার’ তকমা মুছে নিয়ে ‘অফিসার’ উপাধি সেঁটে দিল। তাও আবার পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যতার স্বীকৃতি দিয়ে নয় বরং পরীক্ষাবিহীন বিশেষ করুণাবলে (Auto Promotion) গণপদোন্নতির স্রোতের তোড়ে ভাসিয়ে। যেভাবেই হোক, জুনিয়র অফিসার হতে ‘অফিসার’ পদে যেতে অর্থাৎ একটিমাত্র প্রমোশনের আমীয় স্বাদ লাভ করতে আমার জীবন থেকে শুকনো পাতার মতো ‘ঝুরঝুর ঝরে গেছে’ পনেরোটি বছর। তারপরও অন্তত চাকুরীজীবনের প্রথম (ও সম্ভবত একমাত্র) প্রমোশনটি পেয়ে এখন অফিসার হওয়ার গর্বে বক্ষ আমার অনেকখানি স্ফীত হয়ে আছে। এ যেন স্বপ্নে পাওয়া আমার জীবন্ত সোনার হরিণ। এ আনন্দ রাখি কোথায়? মামু, খামু না গায়ে দিমু (!)।
এভাবে কখন আমার সাধের সাথীরা সকলে ধীরেধীরে আমাকে ফেলে ‘আজ জোসনা রাতে সবাই গেছে বনে’ গাইতে গাইতে বিজন বনে (Upper Rank) হারিয়ে গেলো। এরপর গেলো জুনিয়ররা। তারপর জুনিয়রের জুনিয়রের জুনিয়ররাও আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমি সন্ধ্যাকাশে নিরাশার দীপ্তি ছড়াতে ছড়াতে ধ্রুবতারার মত স্বপদে ধ্রুব থেকে তাদের চলে যাওয়া পশ্চাদপানে ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে আছি। কারণ আমার তো যোগ্যতা (!) নেই। আমার সমস্যা যে বায়বীয় ও ভয়াবহ। ছাত্রজীবনে ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিকতায় আকন্ঠ অবগাহন করেছিলাম, সাহিত্যের রসসুধায় আপাদমস্তক টইটুম্বুর ছিলাম। কিন্তু সেই রস এখন বড্ড তেতো লাগে। এখন ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়…।’ বিপুল কষ্টার্জিত শিক্ষকতার বিএড ও এমএড সার্টিফেকেট দু’খানাও এখন পাংশু (Faded) হয়ে গেছে। ছোটকালের কবিতাটি আজ তেমন মনে পড়ে না-
সাহেব বলেন, ‘চমৎকার!’
মোসাহেব বলেন, ‘চমৎকার সে হতেই হবে
হুজুরের মতে অমত কার?’
আজ হৃদয়মাঝে অভয় বাজে- ‘রিজকের ফায়সালা আসমানে হয়- ধুলির ধরাতে নয়।’
