দারসের নামে এসব কি হচ্ছে?
-মুহাম্মদ দিদারুল আলম
আমাদের কর্মস্থলে নিয়মিত আসরের নামাজের পর নৈতিক প্রশিক্ষণধর্মী ‘দারস’ প্রোগ্রামের ব্যবস্থা রয়েছে। এই কর্মসূচির অধীনে প্রতিদিন একজন কর্মকর্তা একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে নাতিদীর্ঘ শিক্ষণীয় আলোচনা পেশ করে থাকেন। এতে কর্মকর্তা কর্মচারীগণের জ্ঞান ও নৈতিকতার উন্নয়ন (Moral Development) হয় বিশেষ করে বক্তার জ্ঞান ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে।
আরবি শব্দ ‘দারস’ মানে পাঠ, প্রশিক্ষণ, আলোচনা ও শিক্ষণ-শিখন কর্মকাণ্ড। কিন্তু ইসলামি সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে এই শব্দটির কোন সেক্যুলার (Secular) অর্থ করার সুযোগ নেই। এটি ইসলামি কৃষ্টি ও সভ্যতার আত্মীভূত একটি পরিভাষা (Terminology)। তাই সাধারণভাবে দারস মানে কুরআন বা হাদিসের প্রশিক্ষণ, কুরআন বা হাদিসের শিক্ষা নিয়ে বক্তব্য ও আলোচনা। সহজ কথায় দারসুল কুরআন বা দারসে কুরআন মানে কুরআনের দারস এবং দারসুল হাদিস বা দারসে হাদিস মানে হাদিসের দারস। সেদিন অফিসে আমি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম, একজন সিনিয়র কর্মকর্তা তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন এভাবে, আজকে আমার দারসের বিষয় হলো ‘ডিপোজিট মিক্স (Deposit Mix)’। আমি ভাবতে লাগলাম এটা আবার কি ধরনের দারস! কুরআন মজিদের কোন সুরার কোন আয়াত বা কোন হাদিসগ্রন্থের কোন বাব (অধ্যায়)! অন্যদিন আরেকজন কর্মকর্তা বক্তব্যের শুরুতে বললেন, আজকে আমার দারসের বিষয় হলো, ‘আমাদের হেড অফিসের … তারিখের … নং সার্কুলার।’ এভাবেই প্রতিদিন ধারাবাহিক দারস (!) চলে আসছে। আমাদের নিকট বিষয়টি এতটাই স্বাভাবিক ও গা-সওয়া হয়ে গেছে যে এতে কারো মনে কোন ভিন্ন চিন্তার উদ্রেক হয় না এবং এটাকে কেউ অন্যভাবেও দেখে না।
অফিসে প্রতিদিন আসরের নামাজের পর কুরআন ও হাদিসের দারস নাম দিয়ে যে সময় বা শিডিউলটা (Schedule) বরাদ্দ করা হয়েছে তা কেবল কুরআন ও হাদিসের দারসের জন্য ‘খাস’ (নির্দিষ্ট) হয়ে গেছে এবং সেখানে দারসের হক (অধিকার) ও মর্যাদা পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। তাই দারসের জন্য নির্ধারিত এই স্থান ও সময়ে দারসের নাম ব্যাবহার করে অন্য কিছু করা বা ভিন্ন বিষয়ে কথা বলা কুরআনের সুমহান মর্যাদার প্রতি অসম্মান ও বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের নামান্তর।
বিশ্বশ্রষ্টা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নাজিলকৃত আলকুরআনের প্রতিটি বানী অকাট্য সত্য, অক্ষয়-অভ্রান্ত, অতূলনীয় ও পথনির্দেশনামূলক। আল্লাহভীরু সচেতন প্রত্যেক মুসলিম নরনারী আলকু্রআনের বাণী ও শিক্ষার প্রতি অন্তরে অপরিসীম সম্মান লালন করেন। প্রকৃত মুমিন (Devoted Muslim) মাত্রই কুরআনের বাণী, কুরআনের শিক্ষা, কুরআনের আলোচনা ও দারসের প্রতি সর্বদা পরম বিণয়াবত শ্রদ্ধাশীল হয়ে থাকেন। আর তাইতো নিবেদিতপ্রাণ মুসলিমদের কুরআনের প্রতি সীমাহীন আবেগ ও ভালোবাসাকে পুঁজি করে দারসের ছদ্মাবরনে ব্যক্তিগত, ব্যাবসায়িক ও অন্য যে কোন আলোচনা সহজে গলাদ্ধকরণ করানো যায়।
আমি একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক থাকাকালে প্রতিদিন সকালের সমাবেশে (Morning Assembly) প্রথমে কুরআন থেকে তিলাওয়াত তারপর যথারীতি গীতা ও ত্রিপিটক পাঠ করা হতো। আমি বললাম, এখানে প্রাত্যাহিক সমাবেশে পবিত্র কুরআন থেকে তিলাওয়াত করতেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা আমাদের নেই। বরং কুরআন তিলাওয়াতের পরপরই অন্যান্য ধর্মগ্রন্থগুলো থেকেও পাঠ করা মানে কুরআনকে হেয় করা (Demean) এবং ঐ সকল ধর্মগ্রন্থকে কুরআনের সমপর্যায়ে নিয়ে আসা বা কুরআনের মত সেগুলির সত্যতার স্বীকৃতি দেয়া।
যে কোন সভাসমাবেশের সূচনায় (Inauguration) কুরআন তিলাওয়াত করা হলে সেখানে অন্যান্য বাতিল ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ নিষিদ্ধ হয়ে যায়। যে মঞ্চে কুরআন তিলাওয়াত হয় সেখানে আর কোন ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করা মানে কুরআনের সাথে বেয়াদবি ও পরোক্ষভাবে কুরআন অবমাননা (Blasphemy)। কারণ আলকুরআনের দাবী ও ঘোষণানুযায়ী পৃথিবীতে একমাত্র কুরআন ছাড়া অন্য সকল ধর্মগ্রন্থ মিথ্যা, বাতিল, মনুষ্যরচিত ও বিকৃত। তাই আল্লাহর কথার সাথে মানুষের কথা কখনোই সমান্তরাল পেশ করা উচিত নয়। মানুষের বাণী আর আল্লাহর বাণী কখনো এক পাত্রে সমাসীন করা যায় না। এতে সত্য-মিথ্যা একাকার হয়ে যায়। দেবদেবী আর আল্লাহর মর্যাদায় তফাৎ থাকে না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন গণপাঠাগারগুলোতে অসংখ্য বইয়ের সাথে কুরআনগুলো আলাদাভাবে ও সর্বোচ্চ তাকে (Shelf) রাখতে দেখা যায়। এমনকি ব্যবসায়িক লাইব্রেরীগুলোতেও বিক্রির জন্য রাখা কুরআনের কপিগুলোকে আলাদাভাবে সর্বোপরি তাকে (Rack) রাখা হয়। কারণ এটা কুরআনের অদ্বিতীয়ত্ব (Uniqueness) ও অতূলনীয় মর্যাদার দাবী।
ওমর (র:) একবার রাসুল (সা:) এর সামনে তওরাতের একটি বাণী পাঠ করলেন আর বললেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা:), আমরা তওরাতে অনেক সুন্দরসুন্দর কথা দেখতে পাই, আমরা কি সেখান থেকে কিছু লিখে রাখবো? রাসুল (সা:) বললেন, ‘আমি কি এর থেকে অধিক শুভ্র (সুন্দর) হিদায়াত নিয়ে আসিনি? আজ যদি মুছা বেঁচে থাকতো তাহলে আমার অনুসরণ করা ছাড়া তাঁর কোন গত্যন্তর থাকতো না।’
মুহাম্মদ (সা:) এর সামনে আল্লাহর নবী মুছা (আ:)এর রেফারেন্স টেনে আনা মানে বিশ্বনবীর আকাশচুম্বী মর্যাদা ক্ষুন্ন করা এবং আলকুরআনের সামনে অন্য আসমানি গ্রন্থ তাওরাতের সত্য কথাগুলো উদ্বৃতি দেয়াও কুরআনের মর্যাদা লংঘনের শামিল।
একট ধর্মীয় ও আধুনিক ধারার ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কর্মচারীবৃন্দের প্রশিক্ষণ অবশ্যই দরকার কিন্তু তাই বলে কুরআনের দারসের নাম ভাঙ্গিয়ে, কুরআনের দারসের সাথে ভাগাভাগি ও কাড়াকাড়ি করে এবং কুরআনের মর্যাদার জলাঞ্জলি দিয়ে কেন? আল্লাহর বাণী অহী (Divine Revelation) সর্বদা অসীম মর্যাদায় উচ্চকিত। আলকুরআনের দারসের স্থান ও সময় ব্যাবহার করে মানুষের কথা, বৈষয়িক আলোচনা (Worldly Discussion), ব্যাবসা-বাণিজ্যের বিষয়াদি ও লাভ-লোকসানের গল্পগুজব চালানো কুরআনের সম্মানের সাথে যায় কি?
মহান আল্লাহ তা’লা বলেন, তোমরা আমার আয়াতসমূহকে স্বল্পমূল্যে বিক্রি (হীনস্বার্থে ব্যাবহার) করো না।
(23/06/202ইং)
