খুরুশকুল উচ্চ বিদ্যালয় আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে...
-মুহাম্মাদ দিদারুল আলম
(প্রাক্তন ইংরেজি শিক্ষক- খুরুশকুল উচ্চ বিদ্যালয়)
খুরুশকুলের শিক্ষা প্রসারের প্রোজ্জ্বল আলোকবর্তিকা খুরুশকুলের ঐতিহ্যবাহী সর্ববৃহৎ বিদ্যাপীঠ খুরুশকুল উচ্চবিদ্যালয়। আমার যৌবনের স্বর্ণালী সময়ের পাঁচ পাঁচটি বছর কেটেছে এ পবিত্র আঙ্গিনায়।
একেবারে শৈশব থেকেই শিক্ষকতার প্রতি ছিল আমার রহস্যয় এক অদম্য আকর্ষণ। জ্ঞান অন্বেষণ, জ্ঞানসাধনা ও শিক্ষাদান ছিল আমার সহজাত প্রবৃত্তি। প্রথম জীবনের শিক্ষকতার প্রতি প্রবল ও দুর্বিনীত আকর্ষণ আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল এ মহান বিদ্যাপীঠের পবিত্র আঙ্গিনায় শিক্ষকতার চরম সুধা পান করতে। ইতিপূর্বে আমি ডেফোডিলস কিন্ডার গার্টেন, তেতৈয়া তাফহীমুল কুরআন মাদ্রাসা, পিএমখালী উচ্চবিদ্যালয় ও পোকখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি। কিন্তু নিদাগের তপ্ত দাহের মত অতৃপ্ত শিক্ষকমনের চরম তৃষ্ণা তখনো মেটেনি। নিজ এলাকার সুবিশাল ও ঐতিহ্যবাহী প্রাণচঞ্চল খুরুশকুল উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার একটা সুপ্ত বাসনা মনের মুকুরে আমাকে হন্য হয়ে তাড়াচ্ছিল। একদিন মাহেন্দ্রক্ষণে যথারীতি নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতীক্ষার সেই কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নিল আঙ্গিনায় পদচারণা শুরু করি। সেদিন এ প্রতিষ্ঠানকেই বেছে নিয়েছিলাম ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের ধ্রুবতারা হিসেবে। একরাশ স্বপ্ন দেখেছিলাম এ প্রিয় প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে। জীবনের বাকী সময় পার করে দেয়ার প্রত্যাশা নিয়ে স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করেছিলাম এ প্রিয় কর্মস্থলে থেকেই। তাই স্বীয় যোগ্যতার সবটুকু ঢেলে দিয়ে, আবেগ ও প্রজ্ঞা পরিপূর্ণ উজাড় করে এবং শিক্ষাদানের আহরিত সব সূত্র ও কলাকৌশল প্রয়োগ করে অসীম আন্তরিকতায় পাঠদান শুরু করি। অন্যদিকে আমি সেই ছোটকাল থেকেই কবিতা লিখতাম, গান চর্চা করতাম ও ছিলাম আপাদমস্তক রোমান্টিক। বয়স আর রোমান্টিক মানসিকতার কারণে আমার পাঠদানে সেদিন ভিন্ন মাত্রা আসে। এতে বয়:সন্ধিকালের তরুণ শিক্ষার্থীদের মনের খোরাক মিটে। অল্প দিনেই অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীদের মাঝে সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষকে পরিণত হয়ে যাই। স্বীকৃতি আসতে থাকে বিদ্যালয় কমিটি, অভিভাবক ও এলাকার বিশিষ্টজনদের পক্ষ থেকে। সম্ভবত আমার সময়ের একজন শিক্ষার্থীও ছিল না যে আমার পাঠদান কৌশলকে পছন্দ করত না। সেসময়ের ছাত্রছাত্রীদের অনেকেই আজ উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত ও বর্তমানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে সমাসীন। তারাই আমার সেদিনের আন্তরিকতাপূর্ণ সুনিপুণ ও জ্ঞানগর্ভ পাঠদানের জীবন্ত সাক্ষী।
আজ খুব মনে পড়ে হারিয়ে যাওয়া সেই সোনালি দিনগুলো, হাজারো প্রিয় শিক্ষার্থীর নিষ্পাপ চাহনি, কলকাকলি ও শিখন-শিক্ষনের মায়াবী মুহূর্তগুলো। অনেক মিস করি সম্মানিত সতীর্থ কলিকগণকে যাদের সাথে দীর্ঘ পাঁচ/ছয়টি বছর কেটেছে একসাথে এক টেবিলে এক অফিসে; মিস করি তাদের সাথে আড্ডা, গল্প ও চিন্তা বিনিময়ের ক্ষণগুলো। সহগামী শিক্ষকগণের অনেকেই আজ জীবনব্যস্ততার পরিসমাপ্তিতে পরম শান্তিতে বিশ্রাম নিচ্ছেন। জীবিতদের অনেকের সাথে মাঝে মাঝে দেখা হয়। কিন্তু তাদের মাঝে আমার মত সেই আবেগ, অনুভূতি ও রোমান্টিকতা দেখি না।
“কোথায় হারিয়ে গেলো সোনালি বিকেলগুলো সেই, আজ আর নেই...”
আমি বর্তমানে এক প্রাণহীন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিতৃষ্ণ জীবনের পাশবিক ঘানি টেনে টেনে ঘর্মক্লান্ত হচ্ছি। এখানে ভালোবাসা নেই, মায়ামমতা নেই, নেই রোমান্টিকতার অকৃত্রিম পরশ। আছে কেবল জীবন বাস্তবতা ও চরম স্বার্থপরত। শিক্ষকতার মত পবিত্র পেশার কাছে এ জীবন জীবন নয়। এ তো অর্থের পেছনে কুস্তি খেলা অথবা ভাগ্যের দাবা খেলা।
মন চায় বারবার ফিরে যাই খুরুশকুল উচ্চবিদ্যালয়ের সেই ছন্দে ভরা রোমান্টিক শিক্ষক জীবনে। প্রাণচঞ্চল হাজারো প্রিয় ছাত্রছাত্রীর অকৃত্রিম ভালোবাসায় আবারো যেন সিক্ত হই।
প্রিয় ছাত্রছাত্রী ও সতীর্থ শিক্ষকদের নিয়ে আনন্দ বেদনার হাজারো স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই ফেলে আসা কর্মস্থলে।আমি আজ তাই বিরহের গান গাই।
“খুরুশকুল উচ্চ বিদ্যালয় আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে।”
16/04/2022
16/04/2022
