মিডিয়া ফোবিয়া

মিডিয়া ফোবিয়া

 মিডিয়া ফোবিয়া 

-মুহাম্মাদ দিদারুল আলম
============================

সাধারণত যারা একটি দেশ ও জনগোষ্ঠী পরিচালনার নেতৃত্বে থাকেন কিংবা যারা একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে (the leading personnel) অবস্থান করেন তাদের জন্য জনগণের বা অধীনস্থদের অভাব অনুযোগের কথা এমনকি বিরোধীদের সমালোচনা ও তাদের গঠনমূলক দিকনির্দেশনা অধিক ধৈর্যসহকারে শোনা দরকার।

অর্ধপৃথিবীর শাসক আমিরুল মু’মিনীন হযরত উমর এক জুমার দিন মিম্বরে খুতবা শুরু করবেন এমন সময় সাধারণ একজন মুসল্লি দাঁড়িয়ে তার একটি প্রশ্নের উত্তর না দেয়া পযর্ন্ত  তিনি হযরত উমরের খুতবা শোনবেন না বলে জানিয়ে দিলেন। দেশের জনগণ প্রত্যেকে বায়তুলমাল হতে এক প্রস্থ করে কাপড় পেলেও আমিরুল মু’মিনীন উমরের গায়ে দেখা যাচ্ছে দু’টি কাপড়। লোকটি জানতে চান তাহলে কি তিনি খলিফা হিসেবে একটি কাপড় বেশি পেলেন?

আলজেরিয়ার সাবেক সেনাশাসক আহমদ বদিয়াব আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশের তৎকালীন আলোচিত কলাম লেখক দৈনিক সংগ্রামের জহুরী লিখেছিলেন, মানুষের মুখ যখন বন্ধ করে দেয়া হয় তখন মুখের ভাষা বন্দুকের নল দিয়ে গুলি হয়ে বেরিয়ে আসে।

প্রমথ চৌধুরীর মতে, যা কিছু স্বাভাবিক ও সহজাত (natural & inherent) তাকে জোর করে কৃত্রিম পন্থায় অবরুদ্ধ করলে  বা বাঁধাগ্রস্থ করে রাখলে তা আবার বিকৃতরূপেই (distorted) সমাজে ফিরে আসে।

বাংলাদেশের 2009সালের রক্তক্ষয়ী বিডিআর (বর্তমানে BGB) বিদ্রোহে প্রাণ হারান 58জন চৌকষ সেনা কর্মকর্তাসহ আরো অনেকে। কিছুকিছু বিশ্লেষকের মতে এটি ছিল বিডিআর জওয়ানদের মনের দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, বৈষম্য ও না বলতে পারা কথার ভয়াভহ বিস্ফোরণ।

মক্কার কাফের ও ইয়াহুদীরা অনেক সময় উদ্দেশ্যমূলকভাবে নবী (সা) এর কাছে এসে ইসলাম সম্পর্কে অধিক প্রশ্ন করতো আর অহেতুক বাড়াবাড়ি করতো। এতে সাহাবাগণ বিরক্ত হলেও আল্লাহর রাসুল (সা) ধৈয্যসহকারে তাদের কথা শুনতেন। একবারতো এক ইয়াহুদী মসজিদে নববীতে এসে প্রশ্রাব করা শুরু করে দিয়েছিল। সাহাবাগণ ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে মারতে উদ্যত হলে নবী (সা) তাদের বারণ করেন।

ইসলামী রাষ্ট্রে একজন অমুসলিমও স্বাধীনভাবে প্রশাসক বা কর্তৃপক্ষ বরাবর তার নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করতে পারেন। হউক সেটা গ্রহণযোগ্য কিংবা অগ্রহণযোগ্য।

বর্তমান যুগ ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের (civil right) স্বীকৃতির যুগ। আধুনিক যোগাযোগ তথ্য প্রযুক্তি (ICT) বিশেষ করে ইন্টারনেট মানুষের তথ্যবিনিময়, আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ, ব্যক্তিগত অভিরুচি, সমালোচনা, যাচাই-বাছাইয়ের এক অনন্য মাধ্যম। ইন্টারনেটের সামাজিক মাধ্যমগুলোতে আজকাল মানুষ স্বাধীনভাবে নিজেদের সুখ-দু:খ, পছন্দ-অপছন্দ ও বিভিন্ন বিষয়ে ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করে স্বস্তি বোধ  করে থাকে। এ কারণে সামাজিক মাধ্যমে কাউকে ব্যক্তিগত ভারসাম্যপূর্ণ ন্যায়সঙ্গত গঠনমূলক কল্যাণকর ও দিকনির্দেনামূলক মতামত প্রকাশে বাঁধা দেয়া সমীচিন নয়। বর্তমানে দেশে সর্বশ্রেণীর  জনসাধারণ (people of all walks) বিশেষ করে  একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের কর্মরত জনশক্তির জন্য এটি হচেছ একটি উন্মূক্ত মঞ্চ  (virtual platform) আর কর্তৃপক্ষের জন্যও অধীনস্থদের মনোভাব  (trend) সহজে বোঝার এটি একটি আধুনিক মাধ্যম।

বক্যমান আলোচনায় বাংলাদেশের একটি বেসরকারী ব্যাংকের মিডিয়াভীতি (media phobia) প্রাসঙ্গিক। উক্ত প্রতিষ্ঠানের জনশক্তির প্রতি কড়ানির্দেশ রয়েছে যে, কোন কর্মকর্তা ইন্টারনেটভিক্তিক বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (যেমন (Facebook, Instagram, Imo, Messenger, Twitter, Whatsapps, LinkedIn ইত্যাদি) নিজেদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়সহ সংশ্লিষ্ঠ করতে পারবেন না। ভার্সুয়াল প্লাটফর্মে নিজেদের আনন্দ-বেদনা, চিন্তা-অনুভূতি, মতামত ও নির্দেশনামূলক কিছুই কারো সাথে ভাগাভাগি (share/post) করা চলবে না। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হয়ে বা প্রতিষ্ঠানের নাম পরিচয় বহন করে কর্মস্থল বা কর্মজীবনের কিছুই ব্যক্ত করতে তো পারবেনই না এমনকি ভার্সুয়াল জগতে অন্যের মতামতে কোনরূপ শেয়ার, কমেন্ট ও লাইকও করা নিষেধ। আধুনিক প্রযুক্তির অবাধ তথ্য প্রবাহের  যুগে এ ধরনের সংকীর্ণতারোপ কি ব্যক্তিস্বাধীনতার কন্ঠরোধ নয়? এ সংকীর্ণতার যাতাঁকলে তাদের কর্মজীবন যেন একটি মানসিক কারাগার। মানুষ শুধু শ্রমিক নয় তার একটি অনুভূতিসর্বস্ব চিন্তাশীল মনও তো রয়েছে। মানুষতো মানুষই। কেবল আত্মাহীন যান্ত্রিক রোবটের (robot) কোন  অনুভূতি থাকে না, অভাব অভিযোগ ও সুখদু:খ থাকে না।

চোর পুলিশকে ভয় পাবে আর স্বৈরশাসক জনমতকে ভয় পাবে স্বাভাবিক, কিন্তু একজন সৎ স্বচ্ছ ও অকৃত্রিম ব্যক্তি ভিন্ন অর্থে একটি গণমূখী কল্যাণকর প্রতিষ্ঠান যা প্রতারণা ও সবধরণের গর্হিত কর্মকান্ডের উর্ধ্বে অবস্থান করে তার ভয় কিসের? জনমত চেপে রাখা ছাঁইয়ের নিচে আগুন রাখার মত। অন্ধকারে থাকা আর অন্ধকারে রাখা কোনটাই কল্যাণ বয়ে আনে না।  যার নিজের মধ্যে কোন দূর্বলতা থাকে না সে কেন বর্ণচোরা দৃষ্টিভঙ্গি ও লুকোচুরির মানসিকা পোষণ করবে? একটি জনবান্ধব ভাল প্রতিষ্ঠানের অবস্থা, গতি-প্রকৃতি, উদ্দেশ্য ও কর্মরত জনশক্তির মনোভাব বাইরের জগত জানতে পারলে এত ভয় কিসের? এভাবে প্রতিভাবান উৎপাদনশীল কর্মশক্তির মুখে তালা লাগিয়ে তাদের চিন্তা ও মননের অধিকার হরণের কৌশল আদৌ শুভফলদায়ক নয়। দর্শনের ভাষায় একটি প্রতিষ্ঠানও ব্যক্তির মত  অন্তর্মূখী (introvert) না হয়ে বহির্মূখী (extrovert) হতে পারে। যেকোন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গুরুগম্ভীর (aristocratic & serious) না হয়ে সলীলস্বচ্ছ (transparent) হওয়াই ভালো।

বর্তমানে বাংলাদেশের আর্থিকখাতে লাগামহীন অস্থিরতা ও ব্যাপক নৈরাজ্য (anarchy) বিরাজ করছে। অনুমোদিত অননোমোদিত এনজিও, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী, অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠান, সরকারী ও বেসরকারী ব্যাংকসহ বিভিন্ন  আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অসৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতা (ill competition) চরম আকার ধারণ করেছে। এখানে দরিদ্র ও অশিক্ষিত জনগণ প্রতিনিয়ত ধোঁকা প্রতারণা ও জালিয়াতির শিকার হয়ে সর্বস্ব খোয়াচ্ছে। বিশেষকরে বেসরকারী ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা কর্মচারীগণ এখন সঞ্চয়সংগ্রহ (deposit hunting), বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও নানামূখী সার্ভিস প্রদানের মাধ্যমে ব্যবসায় বিস্তারে একপ্রকার দিশেহারা হয়ে নির্ঘুম কালাতিপাত করছেন। এক্ষেত্রে তারা অবাস্তব সব প্রলোভন, সর্বোচ্চ লাভের কল্পিত হার, তূলনামূলক সুবিধা ও আধুনিক ব্যাংকিং সেবার নানা রঙচঙ্গা বাহারী ভাষার (alluring persuasion) মাধ্যমে জনগণকে প্রলুব্ধ করতে হন্যে হয়ে মাঠে (marketing) নেমেছে। কিছুকিছু প্রতিষ্ঠান আবার কেবল নিজেদের অস্তিত্ব ঠিকিয়ে রাখতে অতিরঞ্জন, প্রবঞ্চনা, মিথ্যার আশ্রয়,  তথ্যগোপন, পরচচ্চা ও প্রতিহিংসায় পারঙ্গমতা প্রদর্শন করে চলেছে। এ সকল প্রতিষ্ঠান নিজেদের  স্বরূপ, অভ্যন্তরিন বিষয়াদি, সঠিক ব্যাবসায়িক তথ্য, লাভলোকসানের প্রকৃত অবস্থা, কর্মকর্তা-কর্মচারীর সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি ও তাদের ন্যায়ানুগ অধিকারের বিষয়গুলো অতি সন্তর্পণে এড়িয়ে চলে বা গোপন রাখে। তারা প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতার (institutional transparency) প্রকাশকে রীতিমতো যমের মতো ভায় পায়।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post