রাহুর কবলে শিক্ষাব্যবস্থা
----------------------------------
-মুহাম্মদ দিদারুল আলম
====================
বলা হয় শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। জাতির সেই মেরুদন্ডে আজ পঁচন ধরেছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বিবর্তনের বিভিন্ন ধাপ ও চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এবং ড: কুদরত-ই-খুদার শিক্ষানীতির ছাঁকনিতে নিষ্কাশিত (purify) হয়ে বর্তমান সর্বশেষ প্রমিতরূপ পরিগ্রহ করে একেবারে যেন অভিষ্ঠ বিন্দুতে এসে ঠেকেছে। প্রগতি ও মুক্তচিন্তার এই দিনে শিক্ষাব্যবস্থাকে ইসলামের রাহুগ্রাস (!) মুক্ত করতে না পারলে কি তার যুগোপযোগী আধুনিকায়ন হয়? যদিও এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কখনো পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ছিল না, তথাপি মুসলিম জাতিসত্ত্বানির্ভর ইসলামী ভাবধারার শিক্ষাব্যবস্থার যৎকিঞ্চিৎ ক্ষীণ আভা ছিল তাও ব্লেকমেইল করার চক্রান্ত চলছে বহুদিন ধরে। সেই বৃটিশ আমল থেকেই অবিভক্ত ভারতবর্ষের শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠ্যক্রম (curriculum) নিয়ে চলে আসছে নানা ষঢ়যন্ত্র আর টানাহ্যাঁচড়া।
2023সালের পাঠ্যপুস্তক কেলেংকারির কুশিলবরা শতভাগ সফল হয়েছে। বিদ্যমান অস্থিতিশীল শিক্ষাব্যাবস্থার উত্তপ্ত কড়াইয়ে এবছর নতুন করে ঘি ঢালা হয়েছে। মৌলবাদমুক্ত অসাম্প্রদায়িক একটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করাই ছিল কথিত প্রগতিশীলদের স্বপ্ন। শিক্ষানীতি, শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তকে যে কোন ধরণের ইসলামি সংস্কৃতির উপাদানের উপস্থিতি হল তাদের চক্ষুশুল। ধাপেধাপে শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম পরিবর্তেনের উদ্দেশ্য ছিল পাঠ্যক্রমকে সম্পূর্ণরূপে ইসলামমুক্ত করে তদস্থলে সনাতনী সংস্কৃতির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।
বিতর্কিত নতুন পাঠ্যপুস্তকে অতিসন্তর্পনে বাংলার সুলতানী আমলের মুসলিম শাসকগণের সোনালি ইতিহাস আড়াল করে দেয়া হয়েছে। আগামী প্রজন্ম জানতে পারবে না বাংলার গৌরবময় ইতিহাসে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী কে ছিলেন। এ দেশে হাজী শরীয়তুল্লাহ ও তিতুমীর নামে কেউ ছিল না কিংবা ফরায়েজী আন্দোলন নামে কিছুই হয়নি। সুকৌশলে বুঝানো হয়েছে মুসলমানেরা এদেশে বহিরাগত, দখলদার (intruder) ও লুন্ঠকজাতি এবং এদেশের ইতিহাস ঐতিহ্যে তাদের কোন অবদান নেই। ইনিয়ে বিনিয়ে বাংলার মুসলিম শাসকগণকে অযোগ্য, ভিনদেশী ও আগ্রাসী প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে যে, বৃটিশ খেদাও আন্দোলন তথা এ উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের অংশগ্রহণ ছিল না। অন্যদিকে হিন্দু রাজা ও শাসকগণকে গ্লোরিফাই (glorify) করা, তাদেরকে স্বদেশি, প্রজাবৎসল ও প্রকৃত দেশপ্রেমিক বানানো এবং হিন্দুয়ানী সংস্কৃতিকে এ দেশ এ জাতির মূল সংস্কৃতিরূপে প্রোজ্জ্বলভাবে (highlight) তুলে ধরা হয়েছে। যারা বৃটিশবেনিয়াদের দোসর ছিল ও যারা বৃটিশ শাসকদের লেজুড়বৃত্তি করেছিল তাদেরকে দেখানো হয়েছে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের লড়াকু সৈনিক ও দেশমাতৃকার সুর্যসন্তানরূপে। এ যেন কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন।
ইতোমধ্যেই বিজ্ঞান, প্রগতি, ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িক (secularism) চেতনার দোহাই দিয়ে প্রতিটি শ্রেণির পাঠ্যবইতে বিদ্যমান ইসলামী সভ্যতা, ইসলামী সংস্কৃতি ও ইসলামের ইতিহাসের বিভিন্ন শিক্ষণীয় প্রবন্ধ ও কবিতা এবং মুসলিম মণিষীগণের আদর্শ জীবনী বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়াও নতুন প্রণীত পাঠ্যবইয়ের অনেক জায়গায় ইসলাম ধর্মের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে হেয় ও তাচ্ছিল্যভাবে উপস্থান করা হয়েছে। নতুনভাবে সংযোজন করা হয়েছে একসময়ের চিন্তাজগতে আলোড়নসৃষ্টিকারী অধুনা প্রত্যাখ্যাত ডারউইনের বিবর্তনবাদ (evolutionism)। জাতি জানতে চায়, কেন সেই বস্তাপঁচা বিবর্তনবাদকে ইতিহাসের ডাস্টবিন থেকে কুঁড়িয়ে এনে স্থান দেয়া হয়েছে আমাদের শিশুপাঠ্যবইয়ের পাতায়!
এ পরিকল্পনার শিকড় অনেক গভীরে। একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশে অসংখ্য ইসলামি গবেষক, শিক্ষাবিদ ও প্রজ্ঞাবান আলেম থাকতে খোদ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডসহ শিক্ষাব্যবস্থার প্রায় সকল বিভাগের প্রধানসহ প্রতিটি স্তরে বসানো হয়েছে ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিক ও ভিন্নধর্মাবলম্বীদের। অন্যদিকে রাজনৈতিক নিপীড়নের মাধ্যমে ইসলামি প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া মুখপাত্র ও সংগঠনগুলোকে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে? শীর্ষস্থানীয় ইসলামি স্কলার, ডানপন্থী বুদ্ধিজীবী ও প্রতিবাদী নেতৃবৃন্দের কন্ঠরোধ করা হয়েছে অনেক আগেই। অধিকন্তু শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও পাঠ্যক্রম প্রবর্তন থেকে শুরু করে পাঠ্যপুস্তক রচনা ও সম্পাদনার যাবতীয় কাজের দায়িত্ব যাদেরকে দেয়া হয়েছে তারা সবাই অসাম্প্রদায়িকতার মুখোশে ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী এবং কথিত প্রগতিশীলতার ঝান্ডাধারী।
একটি মুসলিম প্রধান দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এ ধরনের পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক জনগণ যে সহজে মেনে নেবে না তা তারা ভালভাবেই জানত। সঙ্গত কারণে চতুর্দিক থেকে প্রতিবাদ ও সমালোচনার ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করলে তা সামাল দেয়ার জন্য কিছু অগ্রিম ব্যবস্থাও (remedy) রাখা হয়েছে। কিছু পরিকল্পিত বিষয় (ইচ্ছেকৃত ভুল) রাখা হয়েছে, বলা হবে এগুলো ভুল হয়েছে এবং প্রতিবাদের মুখে পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জনের একটি উদ্যোগও নেয়া হবে। এই যে ধরুন, একটি নির্দিষ্ট পাঠ্যবইয়ে 93টি ধর্মীয় প্রতিমার ছবি থাকলে সেখানে বেশ কিছু ছবি কমানো হবে। 17টি মন্দির-প্যাগোড়ার ছবির বিপরীতে মসজিদের ছবি যদি মাত্র 3টি থাকে সেখানে আরো কিছু দৃষ্টিনন্দন মসজিদের ছবি স্থান পাবে, জাতির পিতার নাম সংশোধন করা হবে, বইগুলো ঝকঝকে নতুন প্রচ্ছদে পূণ:মুদ্রিত হয়ে আসবে, গুগল ট্রান্সেলেশন সংশোধন করা হবে, ডারউইনের বিবর্তনবাদ একেবারে উঠিয়ে দেয়া হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। পাঠ্যপুস্তক সংশোনের এই মহতী উদ্যোগ (!) দেখে প্রতিবাদ একেবারে বরফশীতল ঠান্ডা হয়ে যাবে এবং সবাই খুশিমনে সংশ্লিষ্টদের প্রশংসায় পঞ্চমূখ হয়ে ঘরে ফিরে যাবে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে তাদের সেই সুক্ষ্ণ পরিকল্পনার ফাঁদ বুঝতে না পেরে প্রতিবাদী মুসলমানদের বিরাট একটা অংশ আজ ঠিকই উঠেপড়ে লেগেছে শুধু ডারউইনের বিবর্তনবাদের সমালোচনা নিয়ে। এই বিবর্তনবাদ অবশ্যই ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। কিন্তু সুবিধাবাদীরা তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্য জনগণের চোখ ধাঁধাতে (eye wash) এই স্পর্শকাতর বিষয়টিকে একটি হাতিয়ার (demo experimental tool) হিসেবে গ্রহণ করেছে। যখন দেখা যাবে যে সকল আলোচনা-সমালোচনা ও প্রতিবাদ-প্রতিরোধ ডারউইনের বিবর্তনবাদকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে, তখন ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করা সহজ হয়ে উঠবে। এবার উঠিয়ে দেয়া হবে ডারউইনবাদ, শান্ত হবে প্রতিবাদ। এখানেই খেলা শেষ। শিক্ষাব্যাবস্থার মাধ্যমে সহজাত ইসলাম বিদ্বেষী একটি সেক্যুলার আগামী প্রজন্ম (incoming generation) গড়ে তোলার মানসে পাঠ্যপুস্তকে ইসলাম সম্পর্কে ঘৃণা ছড়ানো ও মুসলিম ইতিহাস বিকৃতির (black-mailing) সুপরিকল্পিত কারচুপির (hypocrisy) বিষয়টি চাপা পড়ে যাবে এবং হারিয়ে যাবে লোকচক্ষুর অন্তরালে। বেশ! আসল জায়গায় হাত দিতে হলো না। কী চমৎকার ডিজাইন। উদ্দেশ্য একেবারে সফল। সাপও মরল লাঠিও ভাঙ্গলো না।
(01/02/2023)
