কুদ্দুছ স্যারের ইসলাম ভাবনা

কুদ্দুছ স্যারের ইসলাম ভাবনা

-মুহাম্মদ দিদারুল আলম ।

কুদ্দুছ স্যার

সুদর্শন টগবগে যৌবনের কুদ্দুছ স্যার ছিলেন স্মার্ট, ব্যক্তিত্বশালী ও জনপ্রিয় দক্ষ গণিত শিক্ষক। গণিত পিপাসু ছাত্রছাত্রীরা মৌমাছির মত তাঁর সংস্পর্শ ছাড়তো না। আমি ছোটকালে কুদ্দুছ স্যারের উন্নত ব্যক্তিত্বের কারণে কখনো তার সামনে গিয়ে কিছু বলার সাহস পাইনি। কিন্তু পরবর্তীতে একই স্কুলে চাকুরি করার সুবাদে বয়স ও চাকুরিতে অনেক সিনিয়র সেই কুদ্দুছ স্যার একদিন আমার কলিগ বা সহকর্মী হয়ে যান।


এক) ইসলামের ইতিহাস বনাম মুসলমানদের ইতিহাস

একদিন কোনো এক প্রসঙ্গে আমি ইসলামের সোনালি ইতিহাস নিয়ে কথা বলছিলাম। তিনি প্রতিবাদ করে বললেন, “ইসলামের ইতিহাসে ভালো আর কী থাকবে? আমি পড়েছি, ইসলামের ইতিহাস মানে যত সব হিংসা, কোন্দল ও জিঘাংসার ইতিহাস। ইসলামের ইতিহাসতো খুনাখুনি, যুদ্ধ ও ক্ষমতার কাড়াকাড়ি নিয়ে এক ঝাঁপি কলঙ্কজনক ঘটনাপুঞ্জের সমাহার। আমি বললাম, সে কেমন কথা! ইসলামের ইতিহাস তো আমিও পড়েছি। তিনি কাল বিলম্ব না করেই উমাইয়া-আব্বাসীয় হানাহানির কথা বলা শুরু করলেন। তিনি উমাইয়া শাসনামল পরবর্তী আব্বাসীয় খেলাফতের জনৈক শাসক কর্তৃক রাজনৈতিক প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থ করতে গিয়ে কবর থেকে মৃত শত্রুর হাড় তোলে এনে প্রহার করার প্রসঙ্গ পেশ করে হিমালয়ের এভারেস্ট জয়ের আনন্দানুভূতিতে স্বীয় বক্ষ খানিকটা স্ফীত করলেন।


বাহ! কী চমৎকার ইসলামের ইতিহাস জ্ঞান। এই বীভৎস ও কলঙ্কজনক দৃষ্টান্তগুলোই যে ইসলামের ইতিহাস তাই স্যারের গর্বের বিষয়। এইতো ইসলামি আন্দোলন ও ইসলামের পক্ষে কথা বলা আলেমদের ঘায়েল করার একেবারে মোক্ষম হাতিয়ার।


প্রথমত ইসলামের ইতিহাস ও মুসলমানদের ইতিহাস কখনো এক নয়। যারা ইসলামের ইতিহাস নাম দিয়ে মুসলমানদের ইতিহাস লিখেছেন তাদের অধিকাংশই অমুসলিম ও ইসলামবিদ্বেষী খ্রিষ্টান লেখক। পাশ্চাত্যের এ সকল পক্ষপাতদুষ্ট ইতিহাস লেখক অত্যন্ত সুচতুরভাবে ইসলাম ও মুসলমানদের ঐতিহাসিক অবদান, কীর্তি ও গৌরবগাঁথা (Glory) আড়াল করে দিয়ে কতিপয় ক্ষমতালোভী দু:চরিত্রবান মুসলমান দ্বারা সংঘটিত রাজনৈতিক দাঙ্গাহাঙ্গামা, যুদ্ধবিগ্রহ, মারামারি, খুনখারাবি, রাহাজানি, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, উৎপীড়ন, জুলুম নির্যাতন, বিদ্রোহ ইত্যাদি অপকর্মগুলোকে ফোটিয়ে(Highlight) তোলে ইসলামের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছেন। যুগ যুগ ধরে সারা পৃথিবীজুড়ে এ সকল বিকৃত (!) মুসলিম ইতিহাস ইসলামের ইতিহাস নামে পড়ানো হচ্ছে। আর সে ইতিহাস পড়ে তৈরি হচ্ছে তাদেরই পরিকল্পনার ছকে স্বজাতি বিদ্বেষী জ্ঞানপাপী মুসলমান শ্রেণি।


আমি সেদিন শ্রদ্ধেয় স্যারকে বিনয়ের সাথে অনুরোধ করেছিলাম একেবারে হাতের নাগালে থাকা মাদ্রাসার আলিম শ্রেণির ইসলামের ইতিহাস পাঠ্য বইটির শুধু প্রথম পৃষ্ঠাখানা পড়ে দেখার জন্য যেখানে ইসলামের ইতিহাস আর মুসলমানদের ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করা হয়েছে। 


দুই) ইসলামে আছে  শুধু দলাদলি ও হানাহানি

আমি একদিন ইসলামি জীবন ব্যবস্থার (Code of life) অনুপম বৈশিষ্ট্য নিয়ে কথা বলছিলাম। কুদ্দুছ স্যার ছিলেন ভিন্ন একটি (অনৈসলামিক) রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী। সহজাত ও সংগত কারণে তিনি ইসলামের রাজনৈতিক সৌন্দর্য বর্ণনায় আকৃষ্ট না হয়ে বিতৃষ্ণ হওয়াই স্বাভাবিক। আমার মুখে ইসলামি রাজনীতির কথা শোনে তিনি খানিক মুখ ভেংচিয়ে অবজ্ঞায় ঘাড় বাঁকিয়ে বললেন, “তোমরা যে ইসলামের কথা বলো ইসলামের মধ্যে শুধু দলাদলি, মারামারি ও কাঁদা ছুড়াছুড়ি ছাড়া আর কি আছে। ইসলাম নিয়ে তোমরা কী সমাধান দেবে যেখানে সারা দুনিয়াব্যপি ইসলামের ভেতরেই শুধু সমস্যা আর সমস্যা। দেখ মুসলমানদের মধ্যে কত দল, কত গ্রুপ, কত মত, কত পথ। তোমাদের ভিতর এত হানাহানি ও ঝগড়াঝাঁটি কেন? আলেমে আলেমে দ্বন্দ্ব, মারামারি ও ফতোয়াবাজি। একদল আরেকদলকে সহ্য করতে পারে না। একদল বলে এদিকে এসো আরেকদল বলে ওদিকে যাও। আমরা কোন দিকে যাবো? মানুষকে তোমরা ইসলাম বোঝাবার আগে তোমরা তোমাদের ইসলাম ঠিক করো, আগে তোমরা ঠিক হয়ে যাও, নিজেরা এক হয়ে যাও


স্যারের ভাবখানা এমন যে ইসলামের মত অস্পর্শা অপাঙ্‌ক্তেয় একটি সেকেলে বস্তুর পঙ্কিল ছোঁয়া থেকে নিজেকে সযত্নে দূরে রাখতে পেরে তিনি গর্ববোধ করছেন।


আমি বললাম, আমার মায়ের কোন চারিত্রিক দোষ-ত্রুটি নিয়ে যদি কেউ সমালোচনা করে তাহলে আমিও কি তার সাথে আহ্লাদিত চিত্তে বগল চাপড়াবো? যদি সমাজের লোকেরা আপনার স্ত্রী বা আপনার প্রাপ্ত বয়স্কা মেয়ের বদনাম করে, ঘটনা সত্য এই যুক্তিতে আপনিও কি তাদের সাথে তাল মিলাবেন? এতে কি আপনি মোটেও লজ্জিত, দুঃখিত ও মর্মাহত হবেন না? আপনি কি প্রতিবাদ করবেন না? অভিযোগ সত্য হোক মিথ্যা হোক, আপনি যথাসম্ভব আপনার ঘরের বদনাম গোপন রাখার চেষ্টা করবেন। এখন আসুন, আপনি একজন মুসলমান। ইসলাম আপনার আর আপনি ইসলামের। এই ইসলাম নিয়েই আপনি পরকালে জান্নাত পেতে চান আর জাহান্নাম থেকে বাঁচতে চান। ইসলামের শত্রুরা ইসলাম ও মুসলমান সমাজের অভ্যন্তরীণ দোষ-ত্রুটি নিয়ে সমালোচনা করে বেড়ালে আপনি এত আনন্দ পান কেন? আপনিও তাদের সাথে সুর মিলান কেন? ইসলাম তো আপনার ঘরের বিষয়। ইসলামের দোষ মানে আপনারই দোষ। ইসলামের যে কোন ত্রুটি ও অন্ধকার দিক (যুক্তির খাতিরে) সেতো আপনার লজ্জার বিষয় (Discredit), আপনিইতো একে যথাসাধ্য গোপন রাখার চেষ্টা করে যাবেন। একজন মুসলমান হিসেবে যেখানে আপনার ইসলাম নিয়ে মিথ্যা অভিযোগ ও বদনামের প্রতিবাদ করা উচিত সেখানে আপনি নিজেই তাদের একজন হয়ে গেলেন কেন?


আসলে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ বেনিয়ারা এ উপমহাদেশে শিক্ষার আধুনিকায়ন ও সংস্কারের অজুহাতে বাংলার সুলতানি আমলের ইসলামি শিক্ষা পদ্ধতি ধ্বংস করে দিয়ে মুসলমান সমাজে যে রাশিরাশি ভ্রাতৃঘাতী হিংসার বিষ ঢেলে দিয়েছিল আজও তার বলি হচ্ছি আমরা। শিক্ষা সংস্কারের নামে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় তারা যে হিংসার দাবানল জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছিলো সে অনলে এখনো আমরা জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হচ্ছি।

 

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post