প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আধুনিক ব্যাংকিং
-মুহাম্মদ দিদারুল আলম।
বর্তমান আধুনিক জীবনযাত্রায়
প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগেনি এমন কোন দিক ও বিভাগ নেই। মানবজীবনের
অপরিহার্য অনুষঙ্গ ব্যাংকিং খাতেও প্রযুক্তির
ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। ব্যাংকিং
খাতে আধুনিক প্রযুক্তির
ব্যবহার সামগ্রিক ব্যাংকিং ও গ্রাহকসেবাকে
আরও সহজ, দ্রুত
এবং আরও নিরাপদ
করে তোলেছে। আধুনিক প্রযুক্তি বলতে গেলে ব্যাংকিং জগতে অভাবনীয় বিপ্লব এনেছে।
ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি আধুনিক প্রযুক্তি:
এক) ইন্টারনেট ব্যাংকিং
ইন্টারনেট
ব্যাংকিং হল একটি
আধুনিক পরিষেবা যা
গ্রাহকদের অনলাইনে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট
পরিচালনা করার অনুমতি
দেয়। ইন্টারনেট ব্যাংকিং
ব্যবহার করে গ্রাহকরা
তাদের অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স
পরীক্ষা করতে পারেন; টাকা
জমা, ট্রান্সফার, উত্তোলন
সহ বিভিন্ন বিল পরিশোধ
করতে পারেন, বিনিময়
করতে পারেন, বিনিয়োগ
করতে পারেন এবং
ঋণ নিতে পারেন।
দুই) মোবাইল
ব্যাংকিং
মোবাইল ব্যাংকিং
হল একটি মোবাইল
অ্যাপ্লিকেশন যা গ্রাহকদেরকে
তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট
পরিচালনা করার অনুমতি
দেয়। মোবাইল ব্যাংকিং
ব্যবহার করে গ্রাহকরা
তাদের অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স
পরীক্ষা করতে পারেন, টাকা
জমা করতে পারেন, টাকা
উত্তোলন করতে পারেন, বিল
পরিশোধ করতে পারেন, বিনিময়
করতে পারেন, বিনিয়োগ
করতে পারেন এবং
ঋণ নিতে পারেন।
তিন) ডেবিট কার্ড
পকেট ভর্তি নগদ টাকা বহন করার দিন শেষ। ডেবিট
কার্ড হল একটি
প্লাস্টিক কার্ড যা
গ্রাহকদেরকে তাদের ব্যাংক
অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা
বের করে ব্যবহার
করার অনুমতি দেয়।
ডেবিট কার্ড ব্যবহার
করে গ্রাহকরা দোকানে, অনলাইনে
এবং ATM-এ টাকা
খরচ করতে পারেন।
চার) ক্রেডিট
কার্ড
ক্রেডিট
কার্ড হল একটি
প্লাস্টিক কার্ড যা
গ্রাহকদেরকে তাদের ব্যাংক
অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা
ধার করে ব্যবহার
করার অনুমতি দেয়।
ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার
করে গ্রাহকরা দোকানে, অনলাইনে
এবং ATM-এ টাকা
খরচ করতে পারেন
এবং পরে সেই
টাকা পরিশোধ করতে
পারেন।
পাঁচ) অনলাইন
লেনদেন
অনলাইন
লেনদেন হল একটি
লেনদেন যা ইন্টারনেটের
মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
অনলাইন লেনদেন ব্যবহার
করে গ্রাহকরা পণ্য
এবং পরিষেবা কিনতে
পারেন, বিল পরিশোধ
করতে পারেন, বিনিময়
করতে পারেন, বিনিয়োগ
করতে পারেন এবং
ঋণ নিতে পারেন।
ছয়) বিল
পরিশোধ
আধুনিক জীবনযাত্রায় মানুষ বিভিন্ন রকম
সেবা গ্রহণ করে মাস শেষে বা নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে বিল পরিশোধ করে থাকে। বিল
পরিশোধ হল একটি
লেনদেন যা গ্রাহকরা
তাদের মাসিক বিলগুলি
পরিশোধ করার জন্য
করে থাকেন। বিল
পরিশোধ করা যেতে
পারে ইন্টারনেট ব্যাংকিং,
মোবাইল
ব্যাংকিং, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট
কার্ড বা চেক
ব্যবহার করে।
সাত) মুদ্রা বিনিময়
বর্তমান বিশ্ব হল একটি ‘গ্লোবাল
ভিলেজের’ মত। মানুষ এখন ব্যাবসা-বাণিজ্য, চাকুরি,
ভ্রমণ ও আয় উপার্জনের তাগিদে একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ডে সীমাবদ্ধ থাকতে
পারে না। বিনিময় হল
একটি লেনদেন যা
গ্রাহকরা একটি মুদ্রা
থেকে অন্য মুদ্রায়
টাকা বিনিময় করার
জন্য করে থাকেন।
বিনিময় করা যেতে
পারে ব্যাংক, বিনিময়
অফিস বা অনলাইন
মাধ্যমে।
আট) বিনিয়োগ/ঋণ
ঋণ হল ব্যাংক ব্যাবসার প্রাণ। বিনিয়োগ বা ঋণ প্রদান ছাড়া যেমন ব্যাংক চলতে পারে না তেমনি ব্যাবসা-বাণিজ্যও স্থ বির
হয়ে পড়ে প্রয়োজনীয় তহবিলের অভাবে। বর্তমানে কম্পিউটার
প্রযুক্তির ব্যাবহারের ফলে মান্দাতার আমলের ঋণ প্রক্রিয়া ও বিতরণ পদ্ধতিতে আমুল পরিবর্তন
এসেছে।
নয়) কিউ আর কোড
স্মার্টফোনের এই যুগে আমরা অনেকেই কিউআর
কোড সম্পর্কে জানি। স্মার্টফোনের ক্যামেরা ব্যবহার করে একটি দৃশ্যমান কোড থেকে সহজে
ও দ্রুত বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করা যায় এর মাধ্যমে। আর এটি খুব দ্রুত কাজ করে বলে পেমেন্টের
ক্ষেত্রে সবথেকে বেশি ব্যবহার হতে দেখা যায়। এই কোড ব্যবহার করে ক্যামেরার মাধ্যমেই
দ্রুত পেমেন্ট করা যায় নির্ভুলভাবে।
দশ) মোবাইল অ্যাপস
ব্যাংকিং
এখন হাতের মুঠোয়। নিজের স্মার্টফোন ব্যাবহার করে বাড়িতে বসে দিনরাত ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ
করতে পারেন। আপনার ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড
ব্যবহার করে বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে প্রায় সব ধরণের আর্থিক লেনদেন ঘরে বসে পরিচালনা করতে
পারেন।
এক নজরে আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর ব্যাংকিং সেবা:
# যেকোনো সময়, যেকোনো
জায়গা থেকে ব্যাংকিং
সেবা গ্রহণ করা
যায়।
# ব্যাংকিং সেবার জন্য ব্যাংকে গিয়ে লাইনে
দাঁড়াতে হয় না।
# এখন নগদ টাকা জমা
করা ও উত্তোলন
করা সহজ অনেক সহজ
#
ব্যাংকিং এ্যাপস ব্যবহার করে বিভিন্ন বিল
পরিশোধ ও বিনিময়
করা
# সহজে ব্যাংক হতে বিনিয়োগ/ ঋণ নেওয়া
যায়।
# যে কোন ব্যাংকিং কাজ ও সেবা প্রক্রিয়াকরণের
সময় কম
# সবধরণের ব্যাংকিং সেবার খরচ
কমে গেছে
# তহবিল ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা অধিক সুরক্ষিত
আধুনিক প্রযু্ক্তি: মুদ্রার
ওপিঠ
ব্যাংকিং খাতে
আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের
অনেক সুবিধা রয়েছে, তবে
এর কিছু নেতিবাচক
দিকও রয়েছে। এই
নেতিবাচক দিকগুলির মধ্যে
রয়েছে:
এক) তথ্য
সুরক্ষা ঝুঁকি
আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার তথ্য সুরক্ষা ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে। কারণ, এই প্রযুক্তিগুলি ব্যবহার করে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে সংরক্ষণ করা হয়। গ্রাহকদের সংরক্ষিত তথ্য যে কোন সময় লীক বা হ্যাকারের
কবলে পড়তে পারে। তাই অনাকাঙ্খিত বিপদে ও বিপাকে পড়তে পারে অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।
দুই) চাকরি
হ্রাস
আধুনিক প্রযুক্তির
ব্যবহার ব্যাংকিং খাতে
চাকরি হ্রাস করতে
পারে। ট্রাক্টর ও ধান মাড়াইয়ের বিভিন্ন আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের ফলে হালের বলদ ও চাষা-মজুরের যেমন দিন শেষ হয়ে গেছে, তদ্রুপ ব্যাংকিং খাতেও আধুনিক প্রযুক্তি
ব্যবহার করে অনেক
কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে
করা যেতে পারে, যার
ফলে অনেক কর্মচারীর
প্রয়োজন হয় না।
তিন) অসমতা
বৃদ্ধি
আধুনিক প্রযুক্তির
ব্যবহার সমাজে বৈষম্য
বৃদ্ধি করতে পারে।
কারণ, এই প্রযুক্তিগুলি
ব্যবহার করে যারা
প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম
তারা তাদের সুবিধা
নিতে পারে, অন্যদিকে
যারা প্রযুক্তিগতভাবে
সক্ষম নয় তারা
তাদের সুবিধা থেকে
বঞ্চিত হতে পারে। তাই বাংলাদেশের মত
একটি তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশের আধুনিক ব্যাংকিং সেবায় অসমতা সৃষ্টি স্বাভাবিক।
চার) সম্পদ
হ্রাস
আধুনিক
প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাংকিং
খাতের সম্পদ হ্রাস
করতে পারে। কারণ, প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকার জন্য আধুনিক প্রযুক্তিগুলি
ব্যবহার করতে গিয়ে নতুন ও ছোট ছোট অনেক ব্যাংকের প্রচুর খরচ
বৃদ্ধি
পাবে, যা তাদের নীট লাভে প্রভাব ফেলতে
পারে।
আধুনিক প্রযুক্তির
ব্যবহার ব্যাংকিং খাতে
অনেক পরিবর্তন এনেছে।
এই পরিবর্তনগুলি ব্যাংকিং
খাতকে আরও দক্ষ, দ্রুত
এবং অধিক নিরাপদ করে
তুলেছে। প্রযুক্তির ব্যাবহার
ব্যাংকিং খাতের প্রতিযোগিতা
বৃদ্ধি করেছে ফলে গ্রাহকদের জন্য আরও অধিক ও উত্তম সেবার দ্বার উন্মুক্ত
হয়েছে।
