চন্দ্রনাথের মায়া
-মুহাম্মদ দিদারুল আলম
====================
সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘বনের পাখি গায় বলনা বলনা, ফাগুন মায়া শুধু ছলনা ছলনা’…তমালতলে
ঐ বেণু বাজে,
শিহর লাগে হিয়ামাঝে…’গানের মনমোহিনী আবেশ আমার অবচেতন মনে সুরের ঝংকার তোলতে তোলতে
একসময় তমালবৃক্ষের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। জীবনে কোনোদিন এই বিরল তমালবৃক্ষ দেখিনি।
শুনলাম সীতাকুণ্ডের বিখ্যাত চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে মন্দির পাড়ায় একটি তমাল বৃক্ষ
রয়েছে। তীর্থদর্শনের পূণ্যানুভূতি ও অজানাকে জানার দুর্নিবার কৌতূহল নিয়ে একদিন দেখতে
বেরুলাম সেই রোমান্টিক তমাল বৃক্ষ যার ছায়ায় বসে কল্পিত রাখাল প্রেমিক আনমনে উদাসসুরে
বিরহের বেণু বাজিয়ে চলেছে। সেদিন আমি তমাল বৃক্ষের পাশে কিছুক্ষণ ঠাঁই দাঁড়িয়ে মনের
গহীনে অনুরণিত হওয়া সেই গানের ছিত্রকল্প নীরবে অবলোকন করছিলাম আর মনে হচ্ছিল সতীনাথজী
স্বয়ং তমাল গাছের নিচে বসে বেনুহাতে গানটি গেয়ে যাচ্ছেন।
জীবন-জীবিকার তাগিদে জীবন তরণীর দু’টি বছর
কাটিয়েছিলাম প্রকৃতিকন্যা সীতাকুণ্ডের কোলে, চন্দ্রনাথের
পাদদেশে। সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড় বাংলাদেশ ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রাচীন তীর্থস্থান। সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ মেলায় প্রতি বছর
সারা বাংলাদেশ ও পার্শ্ববতী দেশগুলো হতে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ তীর্থযাত্রী আসেন আধ্যাত্মিকতার
অদৃশ্য টানে পূণ্যার্জনের অসীম প্রত্যাশায়। তীর্থযাত্রীদের অনেকে
অধিক পুণ্য লাভের লোভে এখানে মাসাধিকালও অবস্থান করে থাকেন। সহস্র ভক্তের পদচারণা আর
বর্ণিল সাজে সজ্জিত পুরো সীতাকুন্ড শহরজুড়ে উৎসবের আমেজ চলতে থাকে। হাজার হাজার স্বদেশি-বিদেশি লোকে লোকারণ্য উৎসবের আমেজে সীতাকুন্ড
শহর মুখরিত থাকে বছরের প্রায় এক চতুর্থাংশ সময় জুড়ে।
নয়নাভিরাম অপরূপা সীতাকুন্ড যেন প্রকৃতির এক অকৃপণ বদান্যতা। চারিদিকে শুধু সবুজের
মেলা। সর্বত্র হরিত বৃক্ষরাজি আর ক্ষেত ফসলে ভরা চোখজুড়ানো সবুজের সমারোহ। ছায়াঘেরা
গ্রামের চিকচিক পরিচ্ছন্ন পিচঢালা পথগুলো দেখলে মনে হয় এ যেন পরিকল্পিত কোনো পার্ক।
যেদিকে চোখ যায়- বিস্তীর্ণ মাঠ, পাহাড়, খাল, বিল, রাস্তা, বাড়ির আঙিনা, বেড়িবাঁধ, খালের ধার, পথের দু’পাশ সর্বত্র
শুধু শিম ক্ষেত আর শিম ক্ষেত। আর সেই সবুজের বুক চিরে শহরের পাশ দিয়ে চলে গেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম
রেল সড়ক। দু’পাশে ঘন সবুজ অরণ্যাদি বেষ্টিত রেলসড়কটিও প্রকৃতিপ্রেমিক পর্যটকদের
অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। আমার মনে হয় পল্লিকবি জসিম উদ্দীন সীতাকুণ্ডের এই চোখজোড়ানো
প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখেই তার ‘নিমন্ত্রণ’কবিতাটি
লিখেছিলেন-
“তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়
গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়।
তুমি যদি যাও দেখিবে সেখানে মটর লতার
সনে
শিম আর শিম হাত বাড়ালেই মুঠি ভরে সেই
ক্ষণে
রেল সড়কের ছোট খাদ ভরে, ডানকানা মাছ কিলবিল
করে…”
সীতাকুন্ড শহরের অদূরেই দাঁড়িয়ে আছে বিশাল গগণচুম্বী শতাব্দীর রহস্যেঘেরা চন্দ্রনাথ
পাহাড়। সীতাকুন্ডে এসে চন্দ্রনাথের পিঠে না চড়ে চলে যাবো তা কি করে হয়? আমার মনে চন্দ্রনাথ অভিযানের দুর্নিবার সাধ তীব্রতর হতে লাগলো।
কণ্টকাকীর্ণ চন্দ্রনাথের খাঁড়া গা বেয়ে জংলি ঝোপঝাড় মাড়িয়ে সুউচ্চ চূড়ায় আরোহণ এক চ্যালেঞ্জিং
ও দু:সাধ্য কাজ। খাবারের ‘মোছা’আর পানীয়
জল সাথে নিয়ে একদিন কাকডাকা ভোরে আমি আর ছয়/সাতজন সহকর্মী মিলে এই দু:সাহসিক অসাধ্য সাধনের অভিযানে বেরিয়ে পড়লাম। সবার
শংকা ছিল আমাকে নিয়ে। তারা ভাবছিল পাতলা ও ক্ষীণ কায়ার আমি হয়তো এ বিশাল পর্বতারোহণে
ব্যর্থ হবো। কিন্তু সেদিন আমিই সবার আগে চন্দ্রনাথের ‘এভারেস্ট’ জয় করে
সবাইকে বিস্মিত করেছিলাম।
সীতাকুন্ডে আমার একমাত্র আবাসিক বন্ধু ছিল স্থানীয় মাদ্রাসার বিএসসি (গনিত) শিক্ষক
জাহাংগীর আলম। আমরা একটি ব্যাচেলর বাসায় থাকতাম। তিনি শিক্ষকতার ফাঁকেফাঁকে সাংবাদিকতা
চর্চা করতেন। উদ্দেশ্য, ‘মাস্টার জাহাংগীর’নাম অবলোপনান্তে
‘সাংবাদিক জাহাংগীর’পরিচিতি অর্জন। অন্যদিকে আমি শিক্ষকতা ছেড়ে আসলেও শিক্ষকজীবনের
মায়াবী পিছুটান তখনো আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতো। আমি বারবার ফিরে যেতে চাইতাম শিক্ষকতার
সেই পূন্য পেশায়। অন্যদিকে জাহাংগীর ভাই শিক্ষকতার হীন পেশা ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে চাইতেন
সাংবাদিকতা বা সম্মানজনক ভিন্ন কোন পেশায়। এ যেন ‘নদীর এ পাড় কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপাড়েতে
সব সুখ আমার বিশ্বাস।’
অফিসের সহকর্মী মহিউদ্দীন ভাই বয়সে আমাদের সিনিয়র ছিলেন। আমরা তাকে বিয়ের জন্য
ফুসলাতে ফুসলাতে একেবারে ‘বিয়েপাগল’বানিয়ে
ছাড়লাম। এখন আমরাই তার জন্য অহর্নিশ দিগ্বিদিক পাত্রী খোঁজে হয়রান হচ্ছি।
অনেকদিন খোঁজাখোঁজির পরও উপযুক্ত পাত্রীর সন্ধান না পাওয়ায় ব্যার্থ বিফল মনোরথ মহিউদ্দীন
ভাই একদিন ঘোষণা দিয়ে দিলেন ‘আমি আর বিয়ে করবো না ভাই, তোমরা আমার জন্য আর মেয়ে খোঁজিও না।’
সীতাকুন্ড ডিগ্রি কলেজের ইন্টারমিডিয়েটপড়ুয়া জান্নাত নামের একটি মেয়ের কথা আমার
মনে আসলো। মেয়েটি আমাদের গ্রাহক। সে প্রায়ই আমেরিকা প্রবাসী বাবার পাঠানো টাকা তোলতে
আসতো। একটু শ্যামলা হলেও শান্ত স্বভাবের ঊর্বশী যোড়শী জান্নাত দেখতে চমৎকার ছিল। মেয়েটির
চলনে-বলনে যেমন মাধুরী ছিল তেমনি ছিল জীবনানন্দের
‘মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকাজ’।
আমি একদিন সবার সামনে মহিউদ্দীন ভাইয়ের জন্য মেয়েটির নাম প্রস্তাব করলাম। যারা
তাকে দেখেছেন সবাই একবাক্যে একমত হয়ে গেলেন। স্বয়ং মহিউদ্দীন ভাইও দ্বিমত করলেন না।
এতদিনে যেন একেবারে পারফেক্ট একটি পাত্রীর সন্ধান মিলল। এখন বাকী থাকলো ‘বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে?’ অবশেষে ঘন্টা বাঁধার লোকও খোঁজতে হলো না। একদিন মহিউদ্দীন ভাই
ওই মেয়েটিকে রেমিটেন্সের টাকা প্রদান করার সময় পাঁচ হাজার টাকার স্থলে ভুলে পঞ্চাশ
হাজার টাকা দিয়ে দিলেন। মেয়েটিও তার বাবা পঞ্চাশ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন মনে করে টাকা
নিয়ে চুপচাপ বাড়ি চলে গেল। এদিকে বিকেলে আমাদের
ক্যাশ মিলে না। খোঁজতে খোঁজতে পাওয়া গেলো ক’দিন ধরে
হটটপিকে থাকা সেই জান্নাতকেই বেশি টাকা পে করা হয়ে গেছে। মহিউদ্দীন ভাইয়ের চোখে-মুখে চিন্তার দ্রাঘিমা রেখা স্পষ্ট ভেসে উঠলেও
অফিসে হাসির রোল পড়ে গেলো।
তখন রাত আটটা ছুঁইছুঁই। কী আর করা। নথিপত্র ঘেঁটে অস্পষ্ঠ
ঠিকানা সংগ্রহ করে মহিউদ্দীন ভাইসহ আমরা ক’জন বেরুলাম
সেই কাঙ্খিত জান্নাতের সন্ধানে। সবার চোখেমুখে উদ্বেগ আর রোমান্সের মিশ্র আবেশ। আজ
আমরা টাকা নয়,
যেন জান্নাতকেই চাই।
সীতাকুন্ডের ব্যাচেলর বাসায় আমার বুয়ার কাজ করতো পাশের বাসার ফিরোজের মা নামের
এক তরুণী। ফিরোজের মা পেশায় বুয়া না হলেও আামার অনুরোধে রান্নার কাজে আমাকে সহযোগিতা
করতো। এই মেয়েটি আমাকে অত্যধিক সম্মান করতো আর পরম যত্নের সাথে আমার কাজগুলো করে দিতো।
আমার বিদায়ের কয়েক দিন আগে থেকে আমার জন্য তার বিরহবিধুর ব্যাকুলতা দেখে আমি অবাক হয়ে
যাই আর বিদায়ের দিন তার অঝর নয়নে ক্রন্দন ‘বাহিরে
ঝড় বহে নয়নে বারি ঝরে’ দেখে আমিও ব্যাকুল হয়ে পড়ি। বুয়ারাও যে নীরবে ভালোবাসে জীবনে
এই প্রথম দেখলাম।
একদিন চন্দ্রনাথের পাদদেশ ঘিরে জমে উঠা বিচিত্র বর্ণালী মায়ার বাঁধনগুলো ফসকা গেরোর
মত আস্তে আস্তে ছুটে যেতে লাগলো। মনের গহীনে তমাল তলার সেই রোমান্টিক ভাবাবেগ ধুসর
হয়ে এলো। মহিউদ্দীন ভাইয়ের জান্নাতের মায়া কোন এক অদৃশ্য মায়াজালে হারিয়ে গেল। বিদায়বেলাকার
বুয়ার মায়ায় কাঁদতে চেয়েও আমি কাঁদতে পারিনি, বুয়া একাই
কেঁদেছিল সেদিন।
এভাবে মনের পেন্সিলে সীতাকুন্ডজীবনের মায়ার জটিল বহুভূজ অঙ্কন সমাপ্ত করে ছুটে
চললাম কুহিকীনি মায়াবিনী ঢাকার যান্ত্রিক জীবনপানে-
‘ইটের পাঁজরে লোহার খাঁচায় দারুণ দারুন মর্মব্যাথা’
(ককসবাজার: এগারো/সাত/দু’হাজার তেইশ)
