আমার ডিগ্রী পরীক্ষা: ইংরেজি কৌশল ও বিড়ম্বনা
-মুহাম্মাদ
দিদারুল আলম
ছাত্রজীবনের অম্ল-মধুর স্মৃতিগুলো মাঝেমাঝে মনের নিভৃত কোণে বিরহের ঢেউ তোলে। 1996সাল। জীবনের উনিশতম বসন্তে দাঁড়িয়ে অনাগত স্বপ্নীল দিগন্তে তাকিয়ে। ভবিষ্যতের একরাশ রূপোলি স্বপ্নের ডানায় ভর করে ককসবাজার সরকারি কলেজে ডিগ্রীতে (BSS) সবে ভর্তি হয়েছি। সে বছর হতে ডিগ্রী পরীক্ষায় 100 নম্বরের ইংরেজি বাধ্যতামূলক করা হয়। তাও আবার Communitive English প্রথমদিকে যার সঠিক ধারণা অনেক শিক্ষকেরই ছিলনা। নতুন নিয়মের এই Communitive English এর স্বরূপ, উদ্দেশ্য ও শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতি নিয়ে খোদ শিক্ষকমহলেই নানা মুনির নানামত চলছিল। এর আগে এরশাদ সরকারের আমলে সর্বস্তরে বাংলাভাষাকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে ডিগ্রী থেকে ইংরেজী (Compulsory) বাদ দেয়া হয়েছিল। তাই অনেক বছর পর আবার নতুন করে ডিগ্রীতে ইংরেজী বাধ্যতামূলক হওয়ায় এবারের পরীক্ষার্থীদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। তার চেয়ে বেশী দিশেহারা হয়ে পড়েছেন শিক্ষকগণ।
ইংরেজীর জন্য এবারের ডিগ্রী পরীক্ষার্থীরা বিভিন্ন শিক্ষকের দ্বারেদ্বারে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। শিক্ষকগণও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কী পড়াবেন তাদের প্রাইভেট ছাত্রছাত্রীদের, কীইবা সাজেশন্স দিবেন পরীক্ষার জন্য। ছাত্রছাত্রীদের মাঝে এ টিচার ও টিচার দৌড়াদৌড়ি আর লম্ফঝম্ফ শুরু হয়ে গেছে। বিভিন্ন অখ্যাত কুখ্যাত টিচারের নিকট গিয়ে ইংরেজি প্রাইভেট পড়ার হিড়িক লেগে গেছে।
অনন্যোপায় হয়ে ত্রস্তপদে আমিও ছুটলাম কলেজের ইংরেজি ক্লাশে। তখন ককসবাজার সরকারি কলেজের ইংরেজী শিক্ষক ছিলেন প্রবীন অধ্যাপক নুরুল হক স্যার। টেকপাড়ার পাহাড়তলী রোডে স্যারের বাসা। সে বছর তাঁর বাসায় ডিগ্রীর প্রাইভেট ছাত্রছাত্রীদের তিল ধারনের ঠাঁই ছিলনা। অগত্যা কলেজের ক্লাশই আমার জন্য ভরসা। প্রথম ক্লাশে গিয়েই চক্ষু ছানাবড়া, প্রত্যাশায় গুড়ে বালি। ছাত্র হিসেবে শিক্ষকের বদনাম করতে নেই। কিন্তু তিনি যেভাবে সনাতনী পদ্ধতিতে নতুন সিলেবাসের ইংরেজী (Communitive English) পড়ালেন তাতে আমার মনে হলো এরকম ক্লাশ আর কয়েকটি করলে আমার ইংরেজী জ্ঞান ও দক্ষতা যা আছে তাও লোপ পেতে বেশি দিন লাগবে না। বাদ দিলাম কলেজের ইংরেজী ক্লাশ।
পরীক্ষার্থীরা দিকবিদিক হন্যে হয়ে ঘুরছে ইংরেজি শিক্ষকের খোঁজে। সম্ভাব্য সাজেশন কালেকশনের তুমূল প্রতিযোগিতা। ইংরেজির জন্য সেকি প্রাণান্তকর পেরেশানি। উঠি কি পড়ি মরি কি বাঁচি। আমিও খুজছি ভালো শিক্ষকের গাইড বা শর্ট সাজেশন্স। অনেক বছর পর প্রথমবারের মত ও সম্পূর্ণ নতুন নিয়মের ইংরেজী হওয়ায় কোন শিক্ষকই আসন্ন পরীক্ষার সাজেশন্স আন্দাজ করতে পারছেন না। সিলেবাসের Comprehension, Dialogue, Letter Paragraph ইত্যাদির সাজেশন্স কেউ দিচ্ছেন 100টি করে, কেউ দিচ্ছেন 150/200টির মত কেউবা আরো বেশী। এসব সাজেশন্স দেখে আমি ভাবলাম আমার পক্ষে শুধু Paragraph-ই 200/300টি মুখস্থ করা কশ্মিনকালেও সম্ভব নয়। এখন ভরসা নিজের ইংরেজী পুঁজি যা আছে তার উপর। দেখতে দেখতে কলেজের প্রথম সাময়িক পরীক্ষা হয়ে গেল । পুরো কলেজে ইংরেজীতে একমাত্র আমি 34 নম্বর পেয়ে পাশ করলাম । কলেজের বাকী সব পরীক্ষার্থী ইংরেজিতে সমহিমায় ধরাশায়ী। কলেজের ছাত্রশিক্ষক সবাই আমাকে খুঁজছেন। আমাকে কেউ চিনেন না। আমি তো ইংরেজীর প্রথম ক্লাশ দেখেই ক্লাশই বর্জন করেছিলাম। এরপর আসল দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা। এবারও আমিই কলেজে ইংরেজিতে সর্বোচ্চ মার্ক 46পেলাম। আরো দু’একজন 33/34পেয়ে পাশ করল। বাকী সবার নাম ধরাশায়ীর তালিকায় বহাল তবিয়তে মুদ্রিত থাকল। সবশেষে কলেজের ফাইনাল (টেস্ট) পরীক্ষায় আমি ইংরেজিতে 66পেলাম। এবার দেখা গেল দু’একজন আমার চেয়েও বেশী মার্ক পেয়ে গেল। তারা আদৌ আমার চেয়ে বেশী মার্ক পেয়েছিল না তাদের বেশি মার্ক দেয়া হয়েছিল সে রহস্যের উত্তর স্যারদের কাছে।
অবশেষে একদিন এসে গেল 1997ইং সালের ভয়াল সেই ডিগ্রী ফাইনাল পরীক্ষা।
ইংরেজি প্রশ্নপত্র দেখে পরীক্ষার্থীদের মাথায় হাত প্রাণ ওষ্ঠাগত।
যারা 20/30টা বা আরো বেশী Paragraph
গলাদ্ধকরণ করে এসেছে এবং সাথে আরো শতাধিক
Paragraph এর বইয়ের পৃষ্টা ছিঁড়ে পকেটে করে নিয়ে এসেছে সবাই পরীক্ষার হলে এখন বাকরুদ্ধ । আমি অসহায় আবাল কিন্তু একটা Paragraphও মুখস্ত করিনি।
সাথে কোন নকল কপিও নিয়ে আসিনি। ভরসা
ছিল নিজের অসীম আত্মবিশ্বাসের উপর।
প্রশ্নপত্রে Paragraph
আসল দুটি 1) Tension
ও 2) Your
Favourite Book. প্রথম
Tensionটি ছিল খুবই আনকমন একটা Paragraph
যা কোন সাজেশন্স ও পরীক্ষার বইপত্রে ছিল না।
আর দ্বিতীয়টি হলো একেবারে School
level এর বইপত্রে থাকে । ডিগ্রী পর্যায়ের কোন বই ও গাইডে এটি ছিল না।
যার জন্য কেউ এটি মুখস্তও করেনি এবং সাথে নিয়ে যাওয়া কারো নকল কপিতেও এটি ছিলনা।
এতে সুবিধা হলো আমার।
আমি সুযোগের সদ্ব্যাবহার করলাম ও কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করলাম।
আমি বেছে নিলাম Your
Favourite Book. লিখতে
শুরু করলাম The
Quran is my favourite book...।
আমি কিন্তু সচরাচর বিখ্যাত গ্রন্থ যেমন গীতাঞ্জলি, শাহনামা বা শেক্সপীয়রের কোন গ্রন্থ আমার প্রিয় বই হিসেবে লিখিনি । কারণ আল কুরআনকে যখন আমার ফেবারিট বুক
হিসেবে লিখব তখন নিশ্চয় পরীক্ষক ধরে নিবেন যে পরীক্ষার্থী নিজ থেকেই লিখেছে।
কারণ আল কুরআন Favourite
Book এভাবে পরীক্ষার কোন বই বা গাইডে সাধারণত থাকেনা।
এভাবে প্রশ্নের অন্যান্য আইটেমেও বিভিন্ন চাতুরি ও কৌশল খাটালাম।
দেখা গেল সেবছর ডিগ্রী ফাইনাল (বোর্ড) পরীক্ষায় ইংরেজিতে শতকরা 80জন পরীক্ষার্থী যেখানে পাশ-ফেল নিয়ে হামাগুড়ি খাচ্ছিল সখানে আমি
কলেজের সর্বোচ্চ মার্ক 67 পেয়ে চমক সৃষ্টি করেছিলাম। মার্কশীট আনতে গেলে কলেজের তৎকালীন হেডক্লার্ক মসউদ সাহেব আমাকে মার্কশীট দেখে বলেছিলেন তুমি চট্টগ্রাম চলে যাও, ইংরেজী নিয়ে মাস্টার্স পড়। তখন ককসবাজার সরকারী কলেজে মাস্টার্স ছিল না।
চট্টগ্রাম
কলেজে মাস্টার্স (ইংরেজি)
তে ভর্তি হতে
গেলাম। ভর্তি
পরীক্ষায় অংশ গ্রহণের
কাগজপত্র জমা দেয়ার
সুদীর্ঘ লাইনে সকাল
ন’টা হতে
দাঁড়িয়ে দুপুর প্রায় বারোটা
ছুইছুই। চট্টগ্রাম
কলেজে মাস্টার্স ইংরেজীতে
ভর্তির নিয়ম ছিল
এসএসসি, এইচএসসি ও
ডিগ্রী তিন পরীক্ষাতেই প্রথম/দ্বিতীয়
বিভাগসহ ডিগ্রী Compulsory English
এ শতকরা 60 নম্বন
থাকতে হবে। তবেই ভর্তি (লিখিত) পরীক্ষায়
অংশ গ্রহণের সুযোগ
দেয়া হবে। সেদিন চট্টগ্রাম
কলেজের ইংরেজি মাস্টার্স
ভর্তি বাচাই কমিটির
শিক্ষকগণ প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর
কাগজপত্র ও মার্কশীট দীর্ঘসময় নিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে
পরীক্ষা করছিলেন। অনেককে দেখা
গেল সকাল থেকে লাইনে
দাঁড়িয়ে কাগজপত্র অসম্পূর্ণ
থাকায় অথবা শর্তানুযায়ী
মার্ক না থাকায়
ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমি সন্দেহ
আর নিরাশার দোলাচলে
দুলছিলাম। কি
জানি কি হয়। অবশেষে বাচাই
বোর্ডের সামনে গেলাম। কাগজপত্র পেশ
করলাম। ডিগ্রী
পরীক্ষার মার্কশীটে আমার
ইংরেজি নম্বর
দেখে কলেজের একজন
শিক্ষক একবার আমার
দিকে তাকান আবার
মার্কশীটের দিকে তাকান। তিনি বিশ্বাস
করতে পারছিলেন না
আমার এই চেহারার
ছেলে ইংরেজিতে 67মার্ক
পায় কেমনে যেখানে
স্বয়ং চট্টগ্রাম কলেজ
থেকেও সেবছর সম্ভবত
কেউ ইংজিতে 67 বা তদোর্ধ মার্ক অর্জন করতে পারেনি। একটু
পর জিজ্ঞেস করলেন,
ইংরেজী
প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল
তুমি আগে পেয়েছিলে
তাই না?
আমি
বললাম, ইংরেজি
প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল
আমিতো শুনিইনি। (আসলে সে
বছর ডিগ্রীর ইংরেজি
প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি)
এ কথা শুনে বোর্ডের আরেকজন শিক্ষক
জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের
কলেজে ইংরেজী কে
পড়ান? খুব ভাল
পড়ান মনে হয়।
আমি
দ্রুত বলে দিলাম,
নুরুল হক স্যার। হ্যাঁ তিনি
ভালো পড়ান।
যদিও
আমি নুরুল হক
স্যারের প্রথম ক্লাশেই
বিরক্ত হয়ে আর
কোনদিন ক্লাশে যায়নি। যাক,
তাদের ধারণা ছিল
একজন মফস্বলের ছাত্র
হিসেবে ঐ বছর
আমি ইংরেজিতে 67নম্বর
পাওয়ার পেছনে হয়তো
ফাঁস হওয়া প্রশ্ন
পেয়েছিলাম নতুবা আমার
কলেজের ইংরেজী শিক্ষক
খুবই দক্ষ এবং
ভালো পড়ান।
এরপর লিখিত ভর্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে উত্তীর্ণ হয়ে ঐতিহ্যবাহী স্বপ্নের চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের মাস্টার্স ইংরেজি বিভাগের ভর্তি হয়ে কিঞ্চিত হলেও ইংরেজি সাহিত্যের রসাস্বাধন করতে পেরেছিলাম।
(22/04/2022)
