একজন ডাক্তার হাবিবুর রহমান
ও
আমার
মা
-দিদারুল আলম
ছাত্রজীবনে টিউশনি নামক পঙ্কীরাজে ছড়ে নিজের পড়ালেখার খরচ ও পরিবারের ভরণপোষণসহ
অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার খরচ চালিয়ে অমৃতের স্বাদ লাভ করতাম। আমার মা শ্বাসকষ্টসহ বার্ধক্যজনিত রোগে ভোগছিলেন।
তিনি ডাক্তার হাবিবুর রহমানের নিয়মিত রোগী ছিলেন।
ডাক্তার হাবিবুর রহমান ককসবাজার পানবাজার রোড়ের ডক্টরস চেম্বারে বসতেন। তিনি খুব যত্নসহকারে
রোগী দেখতেন ও রোগীদের সাথে ভালো আচরণ করতেন। বিশেষ করে গ্রামের বয়ষ্ক রোগীরা তার কাছে চিকিৎসা নিলেই ভালো হয়ে যেতেন। তাই অতি অল্পদিনের
মধ্যে তিনি
একজন ভালো ডাক্তার হিসেবে ককসবাজারের জনগনের নিকট বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছিলেন।
তখন ডাক্তার হাবিবুর রহমানের ভিজিট (সাক্ষাৎ ফি) ছিল চারশো টাকা।
তবে মাসের ভিতর সাক্ষাতে হাফ অর্থাৎ দু’শো
টাকা আর একমাস পার হয়ে গেলে চারশো টাকা দিতে হতো।
একবার আমার মা দু’শো টাকা যোগাড় করতে না পেরে মাস পেরিয়ে সপ্তাহখানেক পরে গিয়েছিলেন।
আমরা বললাম এবার চারশো টাকাই নিয়ে যেতে হবে।
মা বললেন, মাত্র কয়েকদিনের জন্য উনি বেশি নিবেন না, দু’শোই নিবেন।
আমি প্রতিমাসে যাইতো ডাক্তার আমাকে চেনেন।
আর যদি তিনি চারশো টাকা চান,
আমি গরীব মানুষ হিসেবে অনুরোধ করে দু’শো দিতে পারবো। টাকা
তোমরা দিও না, আমার হাতে থাকবে, আমিই
দেবো।
সেদিন প্রথম আমি মায়ের সাথে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম।
সিরিয়ালে ডাক পড়লে আমরা ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকলাম।
ডাক্তার সাহেব তাঁর নিয়মিত ও পুরনো রোগী হিসেবে মাকে চিনতে পেরেছেন।
লক্ষ্য করলাম, তিনি ধৈর্যের সাথে মায়ের সব কথা শোনলেন, আন্তরিকতার সাথে পরিক্ষা নিরীক্ষা করলেন ও কিছু মৌখিক পরামর্শ দিয়ে সবশেষে প্রেসক্রিপ্শন লিখে দিলেন।
আমি অদূরে চেয়ারে বসে চুপচাপ সব দেখছিলাম।
মা দু’শো টাকা ফি বের করলেন।
ডাক্তার সাহেব বললেন, দু’শো
নয়, ডেট পার হয়ে গেছে তাই আপনার চারশো দিতে হবে।
মা বললেন, আমি গরীব মানুষ, দু’শো টাকা
এনেছি,
এবার দু’শো
নেন।
মা’র
অনুরোধে ডাক্তার সাহেব চেহারা মলিন করে
দু’শো
টাকা নিলেন ঠিকই আর স্বাভাবিক শান্ত গলায় বললেন, আপনি আমার কাছে আর কোনদিন আসবেন না, অন্য ডাক্তার দেখাবেন।
ডাক্তার মা’কে কি বলছেন আমি প্রথমে লক্ষ্য করিনি। মনে হয় মা ও ডাক্তারের
কথা ঠিক বুঝতে পারেননি।
কিন্তু ডাক্তার সাহেব কথাটা মা কে বারবার বলাতে আমার আর বুঝতে বাকী থাকলো না যে, মা চারশো
টাকার স্থলে
দু’শো টাকা
দেয়াতে তিনি মা কে আর না আসতে বলছেন।
আমি দ্রুত ডাক্তারের কাছে গিয়ে বললাম, না, না,
স্যার, আমার কাছে টাকা আছে,
এই নিন আর দু’শো টাকা। তিনি আমার দু’শো
টাকা নিলেন।
আর কিছু বললেন না।
আমরা চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলাম।
জীবনের দু’যুগ পেরিয়ে আজো ভুলতে পারিনি আমি সেদিনের বেদনাবিধুর স্মৃতিখানা।
মা, তুমি কি ভুলতে
পেরেছো? না, তুমি তো এখন
অন্তিম ঠিকানায় চলে গেছো যেখানে আর কোন হাবিবুর রহমানের দরকার নেই।
হয়তো এতোদিনে তিনিও সেখানে পৌঁছে গেছেন।
(ককসবাজার: 30/03/2023ইং)
