‘হুব্বে রাসুল’: ষঢ়যন্ত্রের সূক্ষ্ণ ফাঁদ
-মুহাম্মদ দিদারুল আলম
‘হুব্বে রাসুল’ (Love for the Prophet) ও ‘ইত্তেবায়ে রাসুল’ (Following the Prophet) দু’টি বহুল প্রচলিত ইসলামি পরিভাষা। ‘হুব্বে রাসুল’ এর অর্থ অন্তরে
আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (সা:) এর প্রতি প্রগাঢ়
ভালোবাসা পোষণ করা। এ ভালোবাসা ঈমানের অনিবার্য দাবী। অন্যদিকে ‘ইত্তেবায়ে রাসুল’ হল মুহাম্মদ (সা) এর জীবনাদর্শের (সুন্নাহর) অনুসরণ করা। এ
অনুসরণ মুসলমান হওয়ার জন্য অপরিহার্য মৌলিক একটি শর্ত (ফরজ)। কিন্তু হুব্বে রাসুল
বা নবিপ্রেম আজ বিশেষ শ্রেণির মানহাজগত পরিচয়ের প্রতীকে (Logo) পরিণত হয়েছে। নবিপ্রেমের নামে নবির প্রতি অতিভক্তি,
অতিরঞ্জন আর বাড়াবাড়ি
সীমা অতিক্রম করেছে। এই হুব্বে রাসুলের ব্যানারের আড়ালে চলছে দ্বীনের অসংখ্য
বিকৃতি, শিরক ও বিদআতের
বেসাতি।
আমাদের প্রাচীন সাহিত্যেও ‘রসুলপ্রশস্তি’
বা ‘নবিবন্দনা’ (নাতে রাসুল)- এর অনেক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
হালআমলে ‘রাসুল আমার
ভালোবাসা রাসুল আমার আলো আশা’, ‘আমি মদিনার
পাগল...সব ভুলিব কিন্তু তোমায় ভুলতে পারি না’, ‘হে রাসুল বুঝিনি আমি রেখেছো বেঁধে কোন সূতোয়
তুমি’, ‘রাসুলের সীমাহীন
ভালোবাসা ছাড়া ঈমানের এতটুকু নেই দাম নেই’ বেশ জনপ্রিয় ও শ্রুতিমধুর গান।
কিন্তু রাসুল (সা) এর জীবনচরিত বা আদর্শ অনুসরণ নিয়ে কয়টি গান বা কবিতা রচিত হয়েছে?
কয়টিই বা জনপ্রিয় হয়েছে?
কারণ রাসুল (সা) কে
ভালোবাসতে কারো আপত্তি নেই কিন্তু অনুসরণ করতে যত বিতর্ক যত বিপত্তি। একজন বাস্তব
রাসুলের চেয়ে একজন ভাবগত রাসুল অনেক নিরাপদ। একজন অনুসৃত রাসুলের চেয়ে একজন মাশুক
রাসুল অনেক সহজ। আল্লাহ যাকে আমাদের জীবনাচরনের সকল ক্ষেত্রে অপরিহার্য অনুসরণীয়
আদর্শরূপে প্রেরণ করেছেন আমরা কেবল তার বন্দনা আর প্রশংসাকীর্তন করে অন্তরের
গহনকোণে জায়গা দিতে পারলেই যেন ঈমানি দায়িত্ব শেষ। আমাদের জীবনের বিশাল
কর্মক্ষেত্রে যেন রাসুল (সা) এর প্রবেশাধিকার নেই। এভাবে একজন মুজাচ্ছাম জীবন্ত
রাসুলকে করা হয়েছে নিছক রূহানী ভালোবাসার বরপাত্র। যেমনটি একজন মৃত মানুষের কোন
ক্ষমতা থাকে না কোন শক্রুও থাকে না, তিনি কেবল ভালোবাসা আর সহানুভূতিই পেতে থাকেন। কী দারুণ কৌশলে এ জাতির
চিন্তাচেতনাকে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছে!
কোন বিষয় যখন তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয়কে আড়াল করে দেয় বা ম্লান করে দেয় অথবা অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের
মর্যাদাকে লঘু করে দেয়, তাহলে উক্ত বিষয়ে
সতর্কতা অবলম্বন করা উচিৎ। যতই যুক্তিগ্রাহ্য ও কল্যাণকর মনে হউক ফরজের চেয়ে
মুস্তাহাবকে অগ্রাধিকার দেয়া যাবে না, রাসুল (সা) এর মর্যাদা বাড়াতে গিয়ে কখনো তাঁকে আল্লাহর আসনে সমাসীন করা যাবে
না, হারামের ব্যাপারে নিরবতা
পালন করে মাকরূহ নিয়ে বেশি মাতামাতি করা নিশ্চয় সন্দেজনক।
অনুসরণ আর ভালোবাসা এক নয়। ভালোবাসা হল একটি আবেগপ্রসূত সুকুমার মানবিক
বৈশিষ্ট্য। এটি একটি সহজাত কোমল, আন্তরিক ও
অনুভূতিমূলক বিষয়। এখানে নেই কঠোরতা, রুক্ষèতা, নিয়মাচার, আইনানুগতা, শাসনবিধি ও কর্তৃত্ব। ভালোবাসায় রয়েছে ভাব ও
আবেগের স্ফুরণ আর অনুসরণে আছে প্রতিপালন ও বাধ্যবাধকতার বেড়ি। ভালোবাসা সরল ও
ভাবগত, অন্যদিকে অনুসরণ
কঠিন ও বাস্তব। ভালোবাসায় কেবল মানসিক সমর্থন বা ইচ্ছেটাই যথেষ্ট। কিন্তু অনুসরণ
শ্রম, ঝুঁকি ও প্রচেষ্টার সাথে
সম্পৃক্ত। ভালোবাসা ও অনুসরণ স্বতন্ত্রভাবেও সম্ভব। কাউকে ভালোবাসতে হলে তার
জীবনাচার অনুসরণ করতে হবে এমনটি নয়। অনুসরণবিহীন ভালোবাসা হয়ে থাকে আবার
ভালোবাসাবিহীন অনুসরণও করা যায়। কিন্তু ভালোবাসাবিহীন অনুসরণে অনুসরণের পূর্নতা
নেই। তবে ভালোবাসার সাথে অনুসরণের বিষয়টি অপরিহার্য নয়। বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা,
নেতার প্রতি ভালোবাসা,
প্রিয়জন বা
প্রিয়ব্যক্তিকে ভালোবাসা, প্রেমিক
প্রেমিকার ভালোবাসা, ভাইবোনের
ভালোবাসা ও পিতামাতার প্রতি ভালোবাসায় অনুসরণের সম্পর্ক নেই। তাই ভালোবাসা
অনুসরণের অনূগামী কিন্তু অনুসরণ ভালোবাসার অনুগামী নয়।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানবজাতির নিকট রাসুলগণকে প্রেরণ করেছেন অনুসরন ও
অনুকরনের জন্য। আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাবহারিক অনুশীলনের একমাত্র মডেল হলেন নবি
রাসুলগণ। আমরা আল্লাহর বান্দা বা আব্দ (গোলাম) ও নবীর উম্মাত। ‘উম্মাত’ মানে অনুসারী (Followers)। নবি রাসুলগণ হলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের
জন্য আদর্শ ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। আল্লাহতা’লা পবিত্র কুরআনে আমাদেরকে রাসুল (সা) এর প্রতি
কেবল ভালোবাসা পোষণ নয় বরং তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণের তাগিদ দিয়েছেন একাধিকবার।
আল্লাহ বলেন- ‘অবশ্যই তোমাদের
জন্য রাসুলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ, তাদের জন্য যারা
আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।’ (আহযাব- ২১)
রাসুল (সা) এর অনুসরণ ও আনুগত্য ছাড়া আল্লাহর আনুগত্যই সম্ভব নয়- ‘যে রাসুলের আনুগত্য করল, সেতো আল্লাহরই আনুগত্য করল।’ (নিসা- ৮০)
রাসুল (সা) অনুসরণবিহীন আমল বাতিল- ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর
আনুগত্য কর এবং রাসুলের আনুগত্য কর। আর তোমরা তোমাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করো না।’
(মুহাম্মদ- ৩৩)
আল্লাহ বলেন- ‘বল, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের
পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন।’ (আলে ইমরান- ৩১)
এখানে আল্লাহকে ভালোবাসতে হলে রাসুল (সা) কে ভালোবাসার কথা না বলে বলা হয়েছে
আল্লাহকে ভালোবাসতে হলে রাসুল (সা) এর অনুসরণ করার কথা।
এমনকি রাসুল (সা) এর অনুসরণ না করাকে কুফরি বলা হয়েছে- ‘বল, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য কর। তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়,
তবে নিশ্চয় আল্লাহ
কাফিরদেরকে ভালোবাসেন না।’ (আলে ইমরান- ৩২)
হুব্বে রাসুল, ইত্তেবায়ে রাসুল
এর পরিপূরক। নবিপ্রেম, নবিপ্রেমিক,
আশেকে রাসুল (সা),
আশেকে মুস্তফা ইত্যাদি
অভিধাগুলো রেসালতের প্রতি চরম স্বীকৃতির বহি:প্রকাশ এবং নবির প্রতি নিরংকুশ ও
চুড়ান্ত ভালোবাসার ইঙ্গিত বহন করে। সাহাবাগণ আল্লাহর রাসুল (সা) কে কেবল অনুসরণ
করতেন না, সাথেসাথে
প্রাণাধিক ভালোবাসতেনও। তারা রাসুল (সা) এর প্রতি ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জীবন
উৎসর্গ করতে দ্বিধাবোধ করতেন না।
রাসুল (সা) বলেছেন- ‘তোমাদের মধ্যে যে
ব্যক্তি তার পিতা, সন্তান ও যাবতীয়
লোকজন থেকে আমাকে অধিক ভালোবাসতে না পারবে সে পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না।’
(বুখারি, মুসলিম)
এ ভালোবাসা জ্ঞাতি, রক্তসম্পর্কিত ও
বন্ধুত্বের ভালোবাসার ন্যায় নয় বরং সর্বক্ষেত্রে সর্বাবস্থায় আল্লাহর রাসূল (সা)
এর নীতি, আদর্শ ও
কর্মপন্থাকে আপোষহীন অনুসরণের ভালোবাসা।
নবি (সা) মক্কার লোকদের নিকট তাওহীদ ও রেসালতের দাওয়াত পেশ করেছিলেন। তাঁর
রেসালতের দাওয়াত এমনটি ছিল না যে, হে লোকসকল,
তোমরা আব্দুল্লাহর পূত্র
মুহাম্মদকে অর্থাৎ আমাকে ভালোবাস তবে তোমরা মুক্তি পেয়ে পাবে (জান্নাত পাবে)। বরং
তিনি তাদেরকে আল্লাহর একত্ববাদ (তাওহীদ) ও তাঁর জীবনাচার (রেসালাত) অনুসরণ করতে
বলেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা) কে প্রেরণ করা হয়েছে অনুসরণের জন্য, শুধুশুধু ভালোবাসার জন্য নয়। তাঁর সর্বাঙ্গ
অনুসরণেই মুক্তি, নিছক অন্তরে
মুহাব্বত পোষণে নয়। আমাদের নবি (সা) এর প্রতি ভালোবাসায় অত্যধিক গুরুত্বারোপ তার
অনুরণের প্রয়োজনীয়তাকে লঘু করে দেয়। মক্কার তৎকালিন মুশরিক নেতৃবৃন্দও রাসুল (সা)
কে পছন্দ করতেন। তিনি ইসলাম প্রচারে নিবৃত্ত থাকলে তাকে তাদের নেতা ও রাজা মেনে
নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কেবল তার জীবন ও আনীত বিধানের অনুসরণ-অনুবর্তন নিয়েই
যত অভিযোগ ছিল তাদের।
নবিপ্রেম নিয়ে বিতর্ক নেই তবে নবির অনুসরণ নিয়ে বিতর্ক হবে কেন? নবিপ্রেম (হুব্বে রাসুল) নিয়ে যত গান কবিতা,
কাছিদা, গজল, প্রশস্তি গাওয়া হয় নবির অনুসরন-আনুগত্য নিয়ে হয় না কেন? আশেকে রাসুল, হাবীবে রাসুল, মদিনার পাগল যত দেখা যায় মুজাহিদে রাসুল,
এতাআতে রাসুল, ইত্তেবায়ে রাসুল, রাসুলের সৈনিক ইত্যাদি ভাষাগুলো তত শোনা যায় না
কেন? নবিঅবমাননায় সারা
মুসলিমবিশ্ব যেভাবে ফুঁসে উঠে, নবিকে জীবন সমাজ
রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণ নির্বাসিত করে রাখলে কারো মাথাব্যাথা হয় না কেন কিংবা
নবিপ্রেমের বিরহব্যাথায় কেউ কাতরায় না কেন? নবিপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যত দিবস যত মিছিল ও যত
সেমিনার হয়, নবির সুন্নাহর
অনুসরণ ও নবির আদর্শ প্রতিষ্ঠা নিয়ে তেমন কিছু দেখা যায় না কেন? সাহাবাগণ নবীকে কুরআনের আলোকে ছায়ার মত অনুসরণ
করতেন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কিন্তু আমরা কেবল সস্তা নবিপ্রেমে পাগলপারা দেওয়ানা
হতে চাই কিন্তু তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের কোন প্রয়োজন বোধ করি না।
ভালোবাসার আকুস্থল ব্যক্তির বক্ষ (অন্তর) পর্যন্ত সীমাবদ্ধ কিন্তু অনুসরনের
পরিমন্ডল অনেক পরিব্যাপ্ত। নবিপ্রেম ব্যক্তিগত অথাৎ নবিপ্রেম ব্যাক্তির ক্বলবে
উন্নয়ন ও পরিশুদ্ধি চায় কিন্তু নবির অনুসরণ সমাজ ও রাষ্ট্রব্যাবস্থা পরিবর্তনের
দাবী করে। নবির অনুসরণে কায়েমি স্বার্থবাদীদের সাথে টক্কর লাগে। কিন্তু নবিপ্রেমের
বদৌলতে হাদিয়া জিলাপী তোহফা জোটে। নবিপ্রেমে ‘আশেকে রাসুল’ উপাধী পাওয়া যায় কিন্তু নবির অনুসরণে রাজনীতির
প্রয়োজন পড়ে ও রাজপথে নামার ডাক আসে। নবির প্রতি ভালোবাসা নিবৃত্তে, একাকিচিত্তে, নিশীথআঁধারে ও নিখরচায়ও চলে, কিন্তু নবির অনুসরণে অর্থ-সম্পদ খোয়াতে হয়,
রক্ত দিতে হয় ও অহর্নিশ
জীবন হারাবার ভয় তাড়া করে ফেরে। তাই বলি, কেবল নবিপ্রেমের বদৌলতে সহজে জান্নাত মিললে, এত কষ্টে নবিকে অনুসরনের বন্ধুর দূর্গম গিরিপথ
পাড়ি দিতে যাবে কে?
ইসলামের শক্রুরা
আমাদের নিয়ে অনেক ষঢ়যন্ত্র ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করেছে। অনেক সময় আমরা নিজেদের
অজান্তে তাদের পাঁতানো ফাঁদে পড়ে যাই। তারা শাশ্বত দ্বীন আলইসলামকে মিথ্যা প্রমাণ
করার জন্য এবং মুসলিম জাতিকে একটি দুনিয়াবিমূখ, অকর্মণ্য, চিরশাসিত ও তাবেদার জাতিতে
পরিণত করে রাখার অভিপ্রায়ে অতিসন্তর্পনে আমাদের মনমগজে সুমিষ্ট বিষ ঢুকিয়ে (Inject) দেয় আর আমরা সে বিষে সম্মোহিত (Mesmerize) হয়ে তৃপ্তির গান গাই। তাই
কোন্ চোরাগলির সূক্ষ্ণপথ দিয়ে উম্মাহর
চিন্তামানসে নবির বাস্তব অনুসরণের বিপরীতে নবিপ্রেমকেই প্রচ্ছন্ন ও প্রোজ্জ্বল (Highlight) করে দেয়া হয়েছে তা ভেবে দেখা দরকার।
(তারিখ:
২৪/০২/২০২৩ইং)
